সিজন 1 অধ্যায় 15 ড্রামা আবেগঘন মুহূর্ত #বিপদ #হাসপাতাল রুহি রাযীন শুভ শিখা

রক্তাক্ত পতনের বিভ্রান্তি

7 মিনিট পড়া 1,097 শব্দ
রক্তাক্ত পতনের বিভ্রান্তি

জ্ঞান ফিরতে উঠে বসতে চাইলেই হাতে তীব্র ব্যাথা অনুভব করলো রুহি-

“উফফ!”

ব্যর্থ হয়ে আবার শুয়ে পড়লো। তখনই কানে এলো-

“আহ, উঠছো কেন? তোমার হাতে স্যালাইন চলছে। নড়াচড়া না করে শুয়ে থাকো নয়তো হাতে ব্যাথা পাবে।”

নিজের বাম হাতের দিকে তাকাতেই স্যালাইনের সুঁচ নজরে এলো রুহির। পুনরায় শুতে যেয়ে মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা টের পেতেই মাথা চেপে ধরলো ডানহাতে। হাতে এলো কপালের দিকের ব্যান্ডেজ। রুহি বারবার হাতিয়ে বুঝলো বেশ বড় ব্যান্ডেজ, চোখ কুঁচকে ফেললেই বড্ড ব্যাথা টের পাওয়া যাচ্ছে। রাযীন খানিকদূরে সোফায় বসে ল্যাপটপে কিছু করছিলো। মাঝে মাঝে রুহির পানে চেয়ে দেখছিলো। ও মাথায় হাত দিতেই উঠে এসে রুহির শিওরে এসে বসলো। হঠাৎ করে রাযীনের এমন ব্যবহারে হতচকিত রুহি নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইলেও পারলোনা। রাযীন ওর বাহু ধরে আটকালো তারপর মাথা ধরে আলতো করে চেপে দিতে লাগলো। রাযীনের এমন আচরণে ভীষণ অবাক হলেও কথা বলার এনার্জি হলো না তার। খানিক বাদে রাযীনই জানতে চাইলো-

“তোমার কি হয়েছিলো বলো তো? এমন ভয়ংকর ভাবে পড়লে কি করে? কপালে তিনটে স্টিচ লেগেছে। অল্প সময়ের মধ্যে মেঝেতে রক্তের বন্যা। ভাগ্যিস নিয়াজ সাথে সাথে টের পেয়েছিলো। তা না হলে খবর ছিলো তোমার সেই সাথে আমাদের। কি হয়েছিলো বলবে? পা পিছলে গেছিলে নাকি?”

নিয়াজ নামটা কানে যাওয়ার সাথে সাথে রুহির কান খাড়া হলো। মনে করার চেষ্টা করলো কি হয়েছিলো। সেকি সত্যিই শুভকে দেখেছিলো নাকি চোখের ভুল? শুভ এখানে কি করে আসবে? ও তো বলেছিলো ওর কেউ নেই, এতিম ছেলে। তাহলে? বেশিক্ষণ ভাবতে পারে না, মাথা ব্যাথায় চোখ মুখ কুঁচকে উঠলো। রাযীনর আলতো হাতের স্পর্শও ভীষণ ব্যাথা দিচ্ছে, বিরক্ত লাগছে।

“জবাব দিচ্ছ না যে?”

রাযীন পূনরায় জানতে চাইতেই রুহি অনেক কষ্টে চোখ মেলে তাকালো-

“কি হয়েছিলো জানি না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাথা ঘুরে উঠলো।”

“ওহহহ।”

“গলা শুকিয়ে গেছে একটু পানি দেবেন?”

“কিন্তু স্যালাইন চলছে যে?”

রাযীনকে একটু দ্বিধাগ্রস্থ দেখায়। জীবনে প্রথমবারের মতো এমন পরিস্থিতিতে পড়ে নিজেকে অসহায় লাগছে রাযীনের। এই মেয়েটার সাথে গত পনেরোদিন ধরে সকাল বিকাল ঝগড়া করতে করতে কেমন একটা বাজে অভ্যাস হয়ে গেছিলো। এখন মেয়েটাকে এমন অবস্থায় বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে কিছুতেই ভালো লাগছে না। নিজের ভেতর অস্থিরতা টের পাচ্ছে বেশ ভালো ভাবেই। রুহি হাত দিয়ে দেখালো-

“সামান্য একটু দিন। এই এতোটুকু।”

রাযীন হেসে দিলো রুহির কথা বলার ভঙ্গিতে। উঠে এসে চামচে করে অল্প একটু পানি নিয়ে রুহির ঠোঁটে ঠেকালো।

“থ্যাংক ইউ।”

“ইউ আর ওয়েলকাম।”

রুহি রুমের চারিদিকে তাকিয়ে অবাক হলো। এটা তো রাযীনের রুম নয়। তাহলে?

“আমরা কোথায় আছি?”

“হাসপাতালে। রুম দেখে বুঝতে পারছো না?”

“হাসপাতালে!”

“বড্ড বাঁচা বেঁচে গেছো আজ। কি রক্ত বাবারে বাবা। তাড়াহুড়ো করে হাসপাতালে না আনলে কি হতো ভাবাই যায় না।”

রুহি হতবাক হয়ে রাযীনের দিকে তাকিয়ে রইলো। এমন ভয়ংকর ভাবে পড়েছিলো নাকি সে? বুঝতে পারেনি তো? কিছু সময় চিন্তিত হয়ে সামনে ঝোলা সাদা পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলো। রা্যীন ফিরে এসে রুহির পাশে বসতে গেলো রুহি বললো-

“থাক আর মাথা টিপতে হবে না। এমনিতেই অনেক ঝামেলা দিয়েছি আপনাকে। আপনি বরং আপনার কাজ করুন।”

“আরে সমস্যা নেই।”

“না প্লিজ। আমি এখন একটু শোব।”

রুহি হাত দেখাতেই রাযীন থমকে গেলো-

“বেশ।”

রাযীন পূনরায় সোফায় ফিরে গেলো। ল্যাপটপে কাজে মন দিতেই রুহি ডাক শোনা গেলো-

“শুনুন, কয়টা বাজে এখন?”

“বিকেল চারটা। কেন বলতো?”

“বিকেল! সারাদিন পার হয়ে গেছে?”

রুহি বিস্মিত কন্ঠে জানতে চাইলো। রাযীন নরম কন্ঠে বলে-

“হ্যা, সারাদিন ঘুমিয়েছো। এখন আবার ঘুমাবে ওষুধের কারনে।”

“ওহহহ।”

“আচ্ছা একটা কথা বলবেন?”

“হ্যা বলো।”

রাযীনের কন্ঠ ততটাই নরম যতটা হওয়া সম্ভব।

“নিয়াজ সম্পর্কে একটু বলুন তো।”

“নিয়াজ!”

রাযীনের কন্ঠে বিস্ময়-

“হ্যা, আপনার ছোট ভাই তো?”

রাযীন মাথা নাড়ে-

“কেন জানতে চাইছো বলতো?”

রুহি চোখ বুঝে ক্লান্ত গলায় বললো-

“থাক বাদ দিন পরে কোন এক সময় শুনবো। এখন একটু ঘুমাই।”

রাযীনের চেহারায় চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো। সেই সময় সামনে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠতেই রেখা মিলিয়ে গেলো আস্তে আস্তে। সে রুহির দিকে একবার তাকিয়ে দেখলো তারপর মোবাইল নিয়ে বেড়িয়ে এলো।

★★★

“বাবা, এতোদিন কোথায় ছিলি বলতো? এতোগুলো বছর নিরুদ্দেশ থাকলি কি করে? মাকে একবারের জন্যও মনে পড়েনি?”

শুভ হাসলো শিখার কথায়। মনটা অন্যদিকে পড়ে আছে, মায়ের প্রশ্নের জবাব দিতে ইচ্ছে না করলেও অনিচ্ছায় মুখ খুলে-

“মনে পড়বে না কেন মা? তবে আমি তো কখনো তোমার অতোর কাছের ছিলাম না। মনে করে দেখো বাসায় থাকতেও তোমার সাথে আমার দেখা হতো কদাচিৎ। আমি আমার জগতে ব্যস্ত তুমি তোমার জগতে। আমরা সবাই একসাথে থেকেও আলাদাই ছিলাম মা। তাই দূরে গিয়ে তোমাদের কথা আমার তেমন মনে পড়েনি। বরং সত্যি বলতে আমি ভালোই ছিলাম একা একা।”

শিখার ছেলের কথা শুনতে শুনতে চোখ ছলছল করে। অভিমানি কন্ঠে বলে-

“ভালোই ছিলি তবে ফিরলি কেন? না ফিরলেই হতো।”

“নিজের প্রয়োজনে ফিরলাম মা। আমার খুব দামী একটা জিনিস এখানে আছে তাই ফিরতে বাধ্য হলাম বলা যায়।”

শুভর শ্বাস গভীর হলো। মনটা চঞ্চল হয়ে আছে। কখন দেখবে তাকে? এখন কেমন আছে ও? জানার তৃষ্ণা বাড়ছে। হাসপাতালে দেখতে যেতে ইচ্ছে করলেও চক্ষু লজ্জায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শিখা অবাক হয়ে ছেলেকে দেখছে-

“দামী জিনিস! কি সেটা?”

“আছে কিছু একটা সে তোমার না জানলেও চলবে। আচ্ছা ওসব কথা বাদ দাও। একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো। বড় আব্বুর এমন অবস্থা হলো কি করে?”

শুভর চোখে সন্দেহ খেলে যায়। মাকে খর চোখে পর্যবেক্খন করে। শিখা ঠোঁট উল্টায়-

“কি করে বলবো বলতো? গলায় ব্যাথা বলে অনেকদিন বলছিলো। টেস্ট করে ক্যান্সার ধরা পড়লো চিকিৎসার মাঝেই হঠাৎ একদিন স্ট্রোক করলো।”

শুভ চুপচাপ বসে শুনলো। মৃদু হাসলো-

“তোমরা তাহলে ভালোই আছো এখন। বড়আব্বু অসুস্থ, বড়মা উদাস হয়ে ঘুরে বেড়ায়। সংসারে এখন তুমিই সব।”

“সে তুই ঠিকই বলেছিস। এই সংসার এখন আমাকেই দেখতে হয়। বড় ভাবি খায় দায় ঘুমায় কোথায় কি হচ্ছে তার কোন খবর রাখে না।”

শিখার কন্ঠে খুশির আভাস লুকোয় না। শুভ উঠে দাঁড়ালো-

“রাজ ভাইয়া হঠাৎ ফিরে এলো যে? কোন বিশেষ কারন আছে কি?”

“কারনটা যে কি সেটা এখনো বুঝতে পারছি না। তবে এবার এসে বিজনেসে নজর দিতে চাইছে। হয়তো বিজনেসের ভার নিতে চায়। তোর বাবা অবশ্য বলেছে, দরকার কি? তুমি দেশে থাকোনা তোমার কেন বিজনেস দেখতে হবে। আমরা তো আছিই দেখার জন্য।”

“ওহহহ। আর এতোদিন বাদে বউ ফেরত আনাটা, সেটা কি?”

“জানিনা বাপু। মাঝে একদিন দেখলাম উকিল এলো ভাইজানের কাছে। তার কিছুদিন পরেই রাজ দেশে ফিরলো। অনেক চেষ্টা চরিত্র করে বউ ফিরিয়ে আনলো। এদিকে কানাঘুষা শুনতে পাই ওখানে নাকি কোন মেয়ের সাথে লিভ টুগেদার করে।”

মায়ের কথা শুনতে শুনতে শুভ দাঁতে দাঁত চাপে। চোখের সামনে সকালের দৃশ্য ভেসে উঠলো। রুহিকে কোলে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গাড়ির দিকে ছুটছে রাজ ভাই। গায়ের রক্ত টগবগিয়ে উঠেছিলো শুভর। তার রুহিকে রাজ ছুয়ে দিচ্ছে ভেবে তখনই ইচ্ছে হচ্ছিলো রাজের হাত ভেঙে দিতে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে বাধ্য হয়ে সব সইতে হলো। এখন সেসব ভেবে আনমনা হয়ে যাচ্ছে শুভ। তাকে এখানে দেখে রুহির রিয়্যাকশন যে খুব খারাপ হবে তাতে সন্দেহ নেই। ওর জন্যই রুহির এ অবস্থা সেটাও বেশ বুঝতে পারছে। শুভ মনে মনে প্রার্থনা করে রুহি যেন ওকে ভুল না বুঝে। কোন উল্টো পাল্টা ডিসিশন না নেয়। একবার যেন শুভর কথা মন দিয়ে শোনে। যাকে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছিলো তাকে কি করে অন্য কারো হতে দেখবে? রুহি যেন বোঝে শুভও নিরুপায় হয়ে এখানে এসেছে। অসহায় বসে থেকে রুহিকে অন্যের হতে দেখা সম্ভব না শুভর পক্ষে।

অধ্যায় 15 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!

রক্তাক্ত পতনের বিভ্রান্তি

অনুচ্ছেদ 1 / 1 চলছে