হঠাৎ করে আমার শাড়ির আঁচলে টান পরতেই পেছনে ঘুরে তাকালাম।তারপর যা দেখলাম তা সহ্য করার মতো অবস্থায় আমি নেই। একটা ছেলে আমার আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ইচ্ছে করছে ঠাটিয়ে একটা চড় মারতে।আমি দুই হাত ঘষে থাপ্পড় মারার প্রস্তুতি নিয়েও ফেললাম।কিন্তু তখনি পেছন থেকে কেউ গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো।
—- কি হচ্ছে এখানে?
আমি পেছনে ঘুরে কথা বলার মানুষটার দিকে তাকালাম।তাকে দেখে মাথাটা আরো বেশি গরম হয়ে গেলো।এটা তো তখনকার ছেলেটা।যার সাথে গেইট দিয়ে ঢুকতে গিয়ে মাথায় ধরাম করে বারি খেয়েছিলাম।কি ছ্যাচড়ারে!! এখন ফলো করতে করতে এখানেও চলে এসেছে। তাকে দেখে যে ছেলেটা আমার আঁচল ধরে রেখেছে সে জলদী করে আঁচল ছেড়ে দিয়ে আমতা আমতা করে বললো।
—- কিছু হইতাছে না বড় ভাই। আমরা তো যাস্ট এমনি দাঁড়িয়ে আছি। (সাথের ছেলেগুলোকে উদ্দেশ্য করে) ঐ চল তোরা।
আমি অবাক চোখে ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম।প্রত্যেকটার চোখে ভয়।কিন্তু এই পুঁচকে ছেলেটাকে ভয় পাওয়ার মতো কোন কারণ আমি খুঁজে পেলাম না।ছেলেগুলোকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে হুংকার মেরে বললো।
— এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
— যাযাযাচ্ছি ভাই।
“যাচ্ছি ভাই” বলে এক মিনিটও দাঁড়ালো না।পরিমরি করে ছুট লাগালো সামনের দিকে।আমি শুধু আহাম্মকের মতো কাহিনি দেখছি।পাশে তাকিয়ে তন্বীকে দেখে আরেকদফা অবাক।উরি মা!!! তন্বী লজ্জায় লাল,নীল সিগন্যাল দিচ্ছে। দুই হাতে শাড়ির আঁচল পেঁচাচ্ছে আর ছেলেটার দিকে তাকিয়ে লজ্জা পাচ্ছে। আমি ওকে কনুই দিয়ে জোরে গুঁতা মেরে জিজ্ঞেস করলাম।
___ এই তোর সমস্যা কি?তুই এরকম আজিব বিহেভ করছিস কেন?
তন্বী লজ্জার হাসি দিয়ে আমাকে বললো,
— কিছু না আপু।
— কিছু তো আছে। কে রে এই ছেলেটা? ওকে দেখে সবাই এমন ভয় পেলো কেন?
তন্বী আমার কথার উত্তর দেওয়ার আগেই ছেলেটা আমার সামনে এসে তার ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে মুচকি হেসে বললো,
— হাই আমি রওনক হাসান।
আমি চোখ দুটো ছোট ছোট করে কড়া গলায় উত্তর দিলাম।
— তো আমি কি করবো?
—- না মানে পরিচিত হতে পারি না।
— কেন? আপনার সাথে আমি কেন পরিচিত হবো?
— আজব, সামান্য একটা বিষয় নিয়ে আপনি এমন বিহেভ কেন করছেন? ভদ্রতার খাতিরে তো ধন্যবাদও বলেননি।আপনাকে ছেলেদের হাত থেকে বাঁচালাম। তার জন্য অন্তত ছোট করে একটা ধন্যবাদ জানাবেন।
—আমি কি বলেছি আপনাকে বাঁচাতে? আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারি।তাই কাউকে দরকার নেই। এমন গায়ে পরা ছেলে আমার একদম পছন্দ না।নিজ থেকে এসে হেল্প করে হাতেম তাঈ হয়ে যাননি।
আমার কথা শুনে তন্বী চোখ, মুখ উল্টে আমাকে মৃদু ধমকের সুরে বললো,
— আহ্ আপু কি শুরু করলে?উনার সাথে এমন করে কথা বলছো কেন?তুমি জানো উনি কে?
—উনি কে তা জানার আমার কোন দরকার নেই। উনি কোন ভিআইপি পার্সন যে তাকে আমার চিনতে হবে?সে যদি কোন রকস্টার, গ্যাংস্টারও হয় তাতেও আই ডোন্ট কেয়ার। তুই এতো এর পক্ষে কথা বলছিস কেন? তোকে কি বশীকরণের তাবিজ করেছে নাকি?
তন্বী লজ্জামাখা মুখে মিনমিন করে বললো,
— তার থেকেও বেশি কিছু করেছে।
—এই তুই কি বললি?
— কিছু না আপু।
তন্বীর দিক থেকে ফিরে রওনকের দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললাম।
— এভাবে কি রাস্তার মাঝখানে সং সেজে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের বাঁদর মুখাখানা দেখাতে থাকবেন,নাকি সরে দাঁড়াবেন।
রওনক কপাল কুঁচকে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
— তুমি তো দেখছি বেশ ঝগড়ুটে।
তার কথা শুনে আমি তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠলাম।সাহস কত বড় আমাকে ঝগড়ুটে বলে।আজ তার একদিন কি আমার যতদিন লাগে।
—এই বেডা এই,ঝগড়ুটে কাকে বলেন হ্যাঁ? চোখ তুলে মার্বেল খেলবো বলে দিলাম।কথাবার্তা সাবধানে। নয়তো আমি কি করতে পারি তা আপনার ধারণারও বাইরে।আর তুমি কি হুম তুমি কি? এটেনশন পাওয়ার জন্য প্রথমে একটু হিরোগিরি করলেন।এখন আবার আপনি থেকে তুমি তে নেমে গেছেন।কি ভাবছেন,কিছু বুঝি না আমি?
তন্বী আমার দুই বাহু ঝাঁকি দিয়ে বললো,
— কি শুরু করলে আপু?চুপ করো।নয়তো তুমি ঠিক থাকবে কিনা তাতে সন্দেহ আছে।
— এই চুপ একদম ভয় দেখাবি না আমায়।
— চলো তো তুমি।তুমি এখানে থাকলে আজ বিশাল বড় ভেজাল করে ফেলবে।
তন্বী আমার এক হাত টেনে নিয়ে যেতে লাগলো।পেছন থেকে রওনক জোরে চেচিয়ে বললো,
— ও ঝগড়ুটে ম্যাম।এট লাস্ট নিজের নামটা তো বলে যাও।
আমি তন্বীর হাত থেকে নিজের হাত ঝাড়া মেরে ছেড়ে পেছন দিকে ঘুরে বললাম।
— আমার কোন নাম নেই। বাবা-মা আকিকা দেওয়ার ভয়ে আমার নাম রাখেনি।যত্তসব ফালতু লোক।
—তুমি তো দেখছি বেশ ত্যাড়া।
—শুধু ত্যাড়া নই।বিশ্ব ত্যাড়া।ত্যাড়ামী আমার রক্তে মিশে আছে।
আরো কিছু বলতে চাইছিলাম।কিন্তু তার আগেই তন্বী আমার হাত ধরে সামনে টেনে নিয়ে গেল।কিছুদূর যেতেই তন্বীর থেকে হাত ছাড়িয়ে ওকে রাগী গলায় বললাম।
—সমস্যা কি তোর? এতো টানাটানি করছিস কেন? আমাকে কি লুটের মাল পেয়েছিস?কখন থেকে হাতটাকে টেনে বাহুর জয়েন্ট খুলে ফেললি।
— তুমি জানো রওনক কে?তুমি ওর সাথে ঝগড়া করতে গেলে কেন?
—তুইও কিন্তু আমাকে ইন্ডাইরেক্টলি ঝগড়ুটে বলছিস।এর ফল কিন্তু ভালো হবে না।তুই ওর পক্ষে আর কথা বলিস না।আমার সহ্য হচ্ছে না।
—দয়া করে একটু থামো তুমি নোভা আপু।রওনক কিন্তু আমাদের কলেজের নতুন ভিপি।ও ঠিক কি কি করতে পারে তার বিন্দুমাত্র ধারণাও ওর নেই।
আমি ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে বললাম।
— সেই যেই হোক।এই নোভা কাউকে ভয় পায় না।
—তুমি কি শুনছো আমি কি বলছি?
—আমি কিছু শুনতে চাইছি না।
—আপু, রওনক ভাইয়া এই কলেজের নতুন ভিপি।তুমি শুনতে পেয়েছো আমি কি বলেছি?
এতক্ষণে ওর কথা আমার কর্ণগোচর হলো।তন্বীর দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো রসগোল্লা করে ফেললাম।তারপর একটা শুকনো ঢোক গিলে আমতাআমতা করে বললাম।
—কি বলিস এসব?আগের ভিপি UV কই?ওরে আল্লাহ এখন কি হবে?আমি তো না জেনে কত কিছু বলে ফেললাম।
—UV এক্সিডেন্ট করছে।তার অবর্তমানে রওনক সব সামলাচ্ছে।তুমি কত কি বলে দিলে তাকে?এখন কি করে বাঁচবে তাই ঠিক করো।
—তুই আমাকে আগে বলবি না।
—তুমি আমাকে বলার সুযোগ দিয়েছো?
—হ্যাঁ রে তন্বী, আমার কি হবে এবার?তুই তো জানিস এই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র স্টুডেন্ট, ভিপি-টিপিকে আমি কত ভয় পাই।আর আমি নিজে ভিপির সাথে ভেজাল করলাম।
—এখন ভয় পাচ্ছো কেন?তখন তো আমার কথা শুনতেই চাচ্ছিলে না।
আমি তন্বীর দিকে তাকিয়ে নিজের মনে বিরবির করে বলে উঠলাম।
—ভাগ নোভা ভাগ।আপাতত আজকে এখান থেকে কেটে পর।কালকে বাকিটা দেখে নিস।
তন্বী আমাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—কি বলছো নোভা আপু?
আমি তন্বীর কথায় মনোযোগ দিতে পারলাম না।তার আগেই আমার চোখ পেছনে চলে গেল।তাকিয়ে দেখি রওনক তার দলবল নিয়ে এদিকেই আসছে।আমি তন্বীকে উদ্দেশ্য করে বললাম।
—কিছু না রে বোইন।আমি এখন দফা হয়ে যাবো।
কথাটা বলেই এক হাতে কুচি ধরে আরেক হাতে কোনরকম শাড়ি উঁচু করে দিলাম ভৌ দৌড়। আমাকে আর পায় কে?পেছন থেকে তন্বী জোরে চেচিয়ে বলছে, “আপু কোথায় যাও?এই আপু!!” কে কার আপু।এবারের সংগ্রাম দৌড় দেওয়ার সংগ্রাম।এবারের সংগ্রাম এখান থেকে পালানোর সংগ্রাম।
#চলবে
রি-চেইক দেওয়া হয়নি। ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।😊