অবুঝ বউ / অধ্যায় 7

অপমানের চড় ও বিষাক্ত আশঙ্কা

লেখক: সুলতানা তমা 6 মিনিট পড়া 908 শব্দ
অপমানের চড় ও বিষাক্ত আশঙ্কা

আজ আমাদের বৌভাত তাই বাসায় অনেক মেহমান সোহাগীর বোন দুলাভাইও এসেছে, আমি ড্রয়িংরুমের এককোনে দাঁড়িয়ে সোহাগীর ছুটাছুটি দেখছি, সোহাগী এমন ভাবে সারা বাসায় ছুটাছুটি করছে ও যে এই বাসার বউ সেটা বুঝার উপায় নেই তবে সবাই ওকে খুব পছন্দ করেছে আর করবেই না কেন আমার পিচ্ছি বউ বলে কথা, সোহাগী আজ সাদা রঙের লেহেঙ্গা পড়েছে আজ ওকে একদম সাদা পরী লাগছে

–নাহিল (কারো ডাক শুনে পিছনে তাকালাম মৌরি এসেছে, বাহ্ যে মেয়ে কখনো শার্ট-প্যান্ট ছাড়া কিছু পড়ে না সে মেয়ে আজ শাড়ি পড়েছে)

–নাহিল কি দেখছ এভাবে

–তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে একদম বাঙালি নারী

–অন্য দিন সুন্দর লাগে না বুঝি

–কিভাবে লাগবে কিসব ড্রেস পড় ছেলেদের মতো

–তোমার চোখে সুন্দর লাগলে আমি প্রতিদিন শাড়ি পড়তে রাজি আছি

–মানে

–কিছুনা তোমার বউ কোথায়

–ওই যে পিচ্ছিদের সাথে কানামাছি খেলছে

–হাহাহাহা এইটা তোমার বউ

–কেন দেখতে খারাপ

–না তবে এতো পিচ্ছি পুরাই বাচ্চা মেয়ে

–হ্যাঁ এই বাচ্চা মেয়েটাকেই আমি ভালোবাসি

–নাহিল তোমার রুচি দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে নাহলে কেউ বাচ্চা মেয়ে বিয়ে করে কি পাবে এই মেয়ের থেকে

–(মৃদু হাসলাম)

নাহিল তুই এখানে আমি তোকে খুঁজতে খুঁজতে….. (আমার মতো সাজিদও মৌরিকে দেখে অবাক হয়েছে বেচারা অর্ধেক কথাতেই আটকে আছে)

সাজিদ: এইটা কি আমাদের মৌরি

মৌরি: তো অন্য কেউ নাকি

সাজিদ: মডার্ন মাইয়া শাড়ি পড়লো কিভাবে

মৌরি: প্রেমে পরলে সব পারা যায়

সাজিদ: হাসাইলি, নাহিল ভাবি কোথায় দেখাবি না নাকি

আমি: তোর সামনেই তো দেখছিস না কানামাছি খেলছে

সাজিদ: হাহাহাহা পিচ্ছি ভাবি, তো তুই এখানে কেন তুইও গিয়ে খেলায় যোগ দে

আমি: ওর মতো আমিও পিচ্ছি নাকি

সাজিদ: দূর চল তো

সাজিদ আমাকে টানতে টানতে সোহাগীর সামনে নিয়ে দাঁড় করালো, সোহাগীর চোখ বাঁধা থাকার কারনে আমাকে না দেখে এসে জরিয়ে ধরলো, চোখের বাঁধন খুলে আমাকে দেখে ও একটু লজ্জাও পেলো না উল্টো লাফিয়ে লাফিয়ে বলছে ধরেছি উফফফ কি মেয়েরে বাবা, রুমে বসা সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে এক আন্টি তো আম্মুকে বলেই ফেললো “ভাবি বউ এনেছ একটা তোমার বাসা আলো করে রাখবে” আমি আর কিছু না শুনে সাজিদকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাইরে চলে আসলাম

হঠাৎ চোখ পড়লো বাগানের দিকে আপু আর দুলাভাই কি নিয়ে যেন কথা কাটাকাটি করছেন ওদের মধ্যে কি প্যাচ চলছে তা আমাকে জানতেই হবে কিন্তু জানতে হলে তো আপুর সাথে আলাদা কথা বলতে হবে এখানে তো দুলাভাই আছে

–সাজিদ

–হুম

–দুলাভাই কে নিয়ে একটু ঘুরতে যা

–কেন

–প্রয়োজন আছে

–ওকে

সাজিদ দুলাভাই কে বুঝিয়ে ঘুরতে নিয়ে গেলো আমি গিয়ে আপুর সামনে দাঁড়ালাম উনি কাঁদছেন

–আপু সবকিছু জানতে চাই প্লিজ বলুন

–হুম

আপু বলতে শুরু করলো…

পাঁচবছর আগে আব্বু আম্মু একটা রোড এক্সিডেন্টে মারা যান, তখন আমার নতুন বিয়ে হয়েছিল সোহাগীও তখন অনেক ছোট ছিল ওকে দেখার মতো কেউ ছিল না তাই আমার কাছে ওকে নিয়ে আসি, প্রথম অবস্থায় আমার শশুড় বাড়ির সবাই সোহাগীকে ভালোবাসত কিন্তু ও যতো বড় হয় সবাই ওকে ততোই অবহেলা করতে শুরু করে, তারমাঝে জানতে পারি আমি কখনো মা হতে পারবো না দোষটা অবশ্য আকরামের কিন্তু আমাদের সমাজ তো নারীদের দোষ দিতে দ্বিধা করে না তাই আমিই দোষী, চাইলে আমি আকরাম কে ডিভোর্স দিয়ে চলে যেতে পারতাম কিন্তু যাই নি বিয়ে তো জীবনে একটাই হয় বাকিটা জীবন নাহয় ওর সাথে থেকেই কাটিয়ে দেই, আমি এসব ভাবলেও ওদের ভাবনা ছিল অন্যরকম একসময় আমার শাশুড়ি বলেন সোহাগীর বোঝা উনারা আর বইতে পারবেন না, এমনো হয়েছে আমার শাশুড়ি প্রায় সময় সোহাগীর উপর হাত তুলেছেন, অনেক চিন্তা ভাবনা করে আমার সব সম্পত্তি আকরামের নামে লিখে দেই এতে সবাই খুশি হয়ে যায় ওরা আবার সোহাগীকে ভালোবাসতে শুরু করে, কিন্তু ওদের লোভটা বেড়ে যায় ওরা এখন সোহাগীর নামের সব সম্পত্তি ভোগ করতে চায় ওর নামে মোটামুটি অনেক বেশিই সম্পত্তি আছে তাই আকরাম লোভ সামলাতে পারছে না কিন্তু সোহাগীর তো ভবিষ্যৎ আছে তাই আমি সম্পত্তি দিতে অস্বীকার করি আর সোহাগী একটু বড় হতেই আকরামের খারাপ নজর পড়ে ওর উপর তাই এই অল্প বয়সে ওকে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করি, তোমার আগে অনেক বিয়ের প্রস্তাব এসেছে কেউ অল্প বয়স দেখে না করে দিয়েছে আর যারা রাজি হয়েছে সবাই সোহাগীর সম্পত্তির লোভে রাজি হয়েছে, তোমাকে যেদিন প্রথম দেখি তখনি আমার ভালো লাগে মনে হয় তুমিই সোহাগীকে আগলে রাখতে পারবে আর তোমার পরিবারের সবাই খুব ভালো মানুষ তাই আমি সোহাগীর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তোমাকে অনুরোধ করি, বোনের সুখের জন্য তোমার কাছে একটু ছোট হলে দোষের কি

আমি: আকরাম

আপু: আমার স্বামী

আমি: উনি কি এখনো সোহাগীকে…

আপু: হ্যাঁ ও এখনো সোহাগীকে খারাপ নজরে দেখে, আগে যদিও ভাবতাম আকরামের সাথে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিবো এখন আর এসব ভাবি না সোহাগী তোমার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিলেই আমি আকরামকে ডিভোর্স দিয়ে দিব

আমি: কিন্তু

আপু: এটাই আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, তোমার কাছে একটাই অনুরোধ সোহাগী বাচ্চা মেয়ে ওকে একটু আগলে রেখ আর আকরাম কখনো সোহাগীর পিছু ছাড়বে না তাই ওকে একটু সাবধানে রেখ

আমি: আপু সোহাগীকে নিয়ে আপনার আর চিন্তা করতে হবে না

আপু: হুম জানি তোমার উপর ভরসা আছে

নাহিল চলো আমার সাথে (সোহাগী এসে আমার হাত ধরে টানতে শুরু করলো)

–কোথায় যাবো

–চল তো

সোহাগীর পিছু পিছু আসলাম ও এসে মৌরির সামনে দাঁড়াল

সোহাগী: এই মেয়েটা কে

আমি: আমার ফ্রেন্ড

সোহাগী: ও আমাকে পঁচা কথা বলছে

মৌরি: এই বেয়াদব মেয়ে আমি কখন তোমাকে পঁচা কথা বললাম

সোহাগী: একটু আগেই তো বললেন আমি পিচ্ছি আমাকে নাহিলের সাথে মানায় না আপনাকে মানায় আরো কতো কিছু

আমি: মৌরি তুমি ওকে এসব বলেছ

সোহাগী: বলেছে তো তাই আমিও উনাকে বলেছি আমি বড় হলে তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিব (ডিভোর্স শব্দটা শুনে যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো)

মৌরি: হ্যাঁ এইটা বলেছি কারন তোমাদের ডিভোর্স…

আমি: (ঠাস)

মৌরি: নাহিল তুমি এই পিচ্ছি মেয়ের জন্য আমাকে থাপ্পড় মারলে

আমি: ভুলে যেও না এই পিচ্ছি মেয়েটাই এখন আমার স্ত্রী

মৌরি আর কিছু না বলে চলে গেলো, আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি সোহাগীর মাথায় ডিভোর্স শব্দটা ঢুকিয়ে দিয়েছে মৌরি, পরে যদি সত্যি ও আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দেয়…

অধ্যায় 7 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!