প্রজাপতির_রং🦋
Part_21+22
#Writer_NOVA
বিস্ফোরিত চোখে আমি সামনের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার কাছে মনে হচ্ছে সারা পৃথিবী ঘুরছে।এমন কিছুও যে আমাকে দেখতে হবে তা জীবনেও কল্পনা করিনি।তাজকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে একটা নারীর অবয়ব।চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।সামনের দেয়াল ধরে নিজের ব্যলেন্স ধরে রাখার চেষ্টা করছি।তারা দুজন আমাকে দেখার আগেই দৌড়ে দরজার সামনে থেকে চলে এলাম।নিজের ডেস্কে এসে দুই হাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙ্গে পরলাম।কার জন্য আমি পাগলামি করি?সে তো অন্য কাউকে নিয়ে ভালোই আছে।
আমিঃ এর জন্য আড়াই বছর আমার খোঁজ নেওয়ার কোন প্রয়োজন মনে করোনি।তোমার তো আমাকে কোন দরকার নেই। আমিই শুধু শুধু পাগলামি করলাম তোমার জন্য। সেদিন তো পারলে আমায় সবকিছু খুলে বলতে পারতে।তাও করোনি।চেহারার বদলের সাথে সাথে আমার মানুষটারও যে বদল হয়ে গেছে তা আমি কখনো ভাবতে পারিনি।নতুন কাউকে নিয়ে তো ভালোই ছিলে তাহলে কেন আমার জীবনে আবার ফিরে এলে।আমি তো তোমার স্মৃতি নিয়ে ভালোই ছিলাম।কেন সবকিছু এলোমেলো করে দিলে, কেন? আমি তোমাকে কিছুতেই ক্ষমা করবো না এনাজ।কিছুতেই না।আমি আবার নিরুদ্দেশ হয়ে যাবো।এবার আমার খোঁজ কেউ পাবে না।সত্যি আমি ছেলে নিয়ে সবার চোখের আড়ালে চলে যাবো।তুমি থাকো তোমার মতো সবাইকে নিয়ে ভালো।আমার কি তাতে?
নিজের মনে কথাগুলো বলতে বলতে ডেস্কের ওপর মাথা রেখে কান্না করতে লাগলাম।হঠাৎ মাথায় কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে গেলাম।জলদী করে চোখের পানি মুছে মুখে মিথ্যে হাসি ফুটিয়ে পেছনে তাকালাম।তাকিয়ে দেখি আদর আমার দিকে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে।
আমিঃ কিছু বলবেন মিস্টার আদর?
আদরঃ কি হয়েছে আপনার ম্যাম?
আমিঃ কই কিছু না তো।আমার আবার কি হবে? আমি একদম ঠিক আছি।
আদরঃ মিথ্যে কেন বলছেন ম্যাম? আমি আপনার কান্নার আওয়াজ শুনেই এখানে এসেছি। কি হয়েছে বলুন না?
আমিঃ আমার কিছু হয়নি।দেখুন এই যে আমি হাসছি।
আদরঃ এটা তো মিথ্যে হাসি।আমাকে ভাই মনে করে বলতে পারেন।আপনার কি এখানে চাকরী করতে কষ্ট হচ্ছে? কিংবা এই অফিসের কোন কর্মচারী আপনাকে কিছু বলেছে? অথবা কেউ কোন অসভ্যতামী,বাজে বিহেভ করেছে? যদি এমনটা হয় তাহলে তার নামটা বলুন।আমি তার কি অবস্থা করি তা আপনি দেখেন।(কঠিন গলায়)
আমিঃ আপনি বলছেন তাতেই আমি খুশি হয়েছি ভাই।কারো সাহস নেই আমাকে কিছু বলার।কারণ আমি তার উচিত জবাব দিতে জানি।আর যেখানে আপনার মতো একটা ভাই আছে সেখানে কেউ কি আমাকে কিছু বলতে পারে বলুন।
আদরঃ ভাই, বলে যখন ডেকেছেন তাহলে ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করতে দিন।কি হয়েছে বলুন ম্যাম?
আমিঃ আপনি আমায় বারবার ম্যাম বলে লজ্জা কেন দিন বলুন তো? আমি বয়সে আপনার থেকে ছোট। তারমধ্যে কাজের ক্ষেত্রেও আপনার জুনিয়র। কিন্তু আপনি ম্যাম ডেকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিন।আমাকে নাম ধরে ডাকলে খুশী হবো।
আদর মুচকি হেসে জিহ্বায় কামড় দিয়ে বললো।
আদরঃ হ্যাঁ,আপনি আমার বয়সে ও কর্মক্ষেত্রে জুনিয়র। কিন্তু অন্য দিক দিয়ে আপনি আমার বড়।আপনাকে যদি আমি নাম ধরে ডাকি তাহলে হয়তো আপনাকে আমার অসম্মান করা হবে না ঠিক।কিন্তু অন্য কাউকে যে অসম্মান করা হবে।আর আমি তাকে কখনোই অসম্মান করতে চাই না।
আমি চোখ,মুখ কুঁচকে আদরের দিকে তাকালাম।আদর কি জানে তাজ আমার হাসবেন্ড এনাজ? নয়তো এসব কথা কেন বললো? আমার মনে হচ্ছে আদর জানে।কিন্তু আন্দাজে ঢিল মেরে তো লাভ নেই।
আমি চোখ দুটো ছোট ছোট করে আদরকে জিজ্ঞেস করলাম।
আমিঃ কাকে অসম্মান করতে চাইছেন না?
আদরঃ ম্যাম,থাকুক ওসব কথা। পরে একদিন খুলে বলবো।আপনার কি হয়েছে তাই বলেন?
আমিঃ কথা ঘুরিয়ে ফেললেন।আচ্ছা, বলতে যখন চাইছেন না জোর করবো না। আপনি কি আমার একটা উপকার করতে পারবেন আদর?
আদরঃ কি উপকার ম্যাম? আপনি শুধু হুকুম করুন বান্দা হাজির আছে আপনার সেবায়।
আমিঃ আমার না অনেক খারাপ লাগছে।আমি কি আজ বাসায় চলে যেতে পারি।আপনাকে বললাম,আপনি না হয় আপনার স্যারকে বলে দিবেন।
আদরঃ কি হয়েছে ম্যাম? আপনার কি শরীর খারাপ? স্যার কে ডাকবো?(ব্যস্ত হয়ে)
আমিঃ না না তেমন কিছু নয়।আপনি ব্যস্ত হয়েন না।আমার এমনি ভালো লাগছে না তাই বাসায় চলে যেতে চাইছি।
আদরঃ কিন্তু ম্যাম,স্যারের অনুমতি ছাড়া কেউ তো ওয়ার্ক টাইমে বাসায় যেতে পারে না। আপনি স্যারের থেকে অনুমতি নিবেন প্লিজ। আমি আপনাকে অনুমতি দিতে পারবো না। আই এম এক্সট্রিমলি সরি ম্যাম।
আমিঃ আপনি একটু ম্যানেজ করে নিয়েন ভাই। আমি আজ এখানে থাকলে দম বন্ধ হয়ে মারাই যাবো।আর আপনার স্যারের মুখোমুখি আমি হতে চাইছি না।
আদর কিছু সময় চুপ করে কি জানি ভাবলো।বেচারাও পরে গেছে বিপাকে।তাজ এক সপ্তাহ পর আজই অফিসে এসেছে। আজই কোন ঝামেলা হোক তা আদর চাইছে না,তা আমি বুঝতে পারছি। অপরদিকে আমাকে বলেছে যে কোন সাহায্য করবে।কিছু সময় ভেবে বললো।
আদরঃ আচ্ছা ম্যাম,আপনি যান।আমি সবকিছু সামলে নিবো।
আমিঃ অনেক অনেক শুকরিয়া ভাই।
আদরকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি একমিনিটও দেরী করলাম না।দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে লিফটে উঠে গেলাম।লিফটে উঠে দেখি তখনকার ঐ মেয়েটা।যে তাজকে জড়িয়ে ধরেছিলো।দেখে ভদ্রই মনে হচ্ছে। পরনেও ভদ্র মেয়েদের পোশাক।খুব মনোযোগ সহকারে মোবাইল কিছু একটা দেখছে।যার কারণে পাশে কে আছে সেদিকে নজর নেই।আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম।ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে।
🦋🦋🦋
প্রায় আধ ঘন্টা ধরে আমি থম মেরে বসে আছি। কখন থেকে তায়াং ভাইয়া আমাকে জিজ্ঞেস করে যাচ্ছে কি হয়েছে আমাকে বল, কিন্তু আমি কোন উত্তর দিচ্ছি না। একসময় তায়াং ভাইয়া আমার দুই বাহু ধরে জোরে ঝাঁকি দিয়ে বললো।
তায়াংঃ ঐ নোভা কি হয়েছে তোর? তুই এমন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কি হয়েছে আমাকে বলবি তো? কি সমস্যা?
আমি তায়াং ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে চোখের পলক ফেলে আবার তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।মানুষটা আমার জন্য পাগল হয়ে যায়।সবসময় আমাকে ছায়ার মতো আগলে রাখে।অফিস থেকে বেরিয়ে সবার প্রথমে আমি ওকে কল করে এখানে আসতে বলেছি।আমার বলতে দেরী কিন্তু ওর আসতে দেরী হয়নি।হুট করে আমি তায়াং ভাইয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম।এতে তায়াং ভাইয়া আরো বেশি অবাক হলো।
তায়াংঃ কি হয়েছে তোর? আমায় বলবি না বোইন।
আমিঃ হুম।
তায়াংঃ তাহলে বল কি হয়েছে?
আমিঃ (নিশ্চুপ)
বরফও যেমন উষ্ণ ছোঁয়া পেলে গলে যায়।তেমনি আমি সারা পৃথিবীর কাছে কঠিন থাকলেও এই মানুষটার কাছে গলে যায়। এই ভাইটা যে আমাকে আমার নিজের থেকে ভালো বোঝে।তায়াং ভাইয়া আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলো না। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।হয়তো আমাকে কাঁদতে দিলো।কান্না করলে মন হালকা হয় তাই হয়তো আজ কান্না করতে মানা করেনি।কিছু সময় পর আমি কিছুটা স্বাভাবিক হলাম।তায়াং ভাইয়াকে ছেড়ে দূরে সরে দাঁড়ালাম। তায়াং ভাইয়া আমার হাত ধরে সামনের বেঞ্চে নিয়ে বসালো।তারপর তার এক হাত আমার গালে আলতো করে রেখে বললো।
তায়াংঃ এবার বল কি হয়েছে?
আমি এখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি। আমাকে আশ্বস্ত করে তায়াং ভাইয়া বললো।
তায়াংঃ আমাকে বল না রে শাঁকচুন্নি কি হয়েছে তোর? আমি সব ঠিক করে দিবো।
আমি চোখ মুছে তখনকার ঘটনা খুলে বলতে লাগলাম।
ফ্লাশব্যাক………..
অফিসে এসেই শুনতে পেলাম আজ অফিসে তাজ এসেছে। ওর ইংল্যান্ডের ব্যবসা সংক্রান্ত কাজ শেষ। আমি তাতে খুশি বা বেজার কোনটাই হলাম না।তবে সাবধান হয়ে গেলাম এর থেকে আমাকে এখন থেকে দূরে দূরে থাকতে হবে।এর সামনেও আমি যেতে চাই না।ডেস্কে বসে ফাইল উল্টেপাল্টে দেখছিলাম।সামনের সপ্তাহে কতগুলো বিদেশি ক্লায়েন্ট আসবে তাদের প্রোডাক্ট নিতে।সেগুলোর চেক দিচ্ছিলাম।হঠাৎ আমার এক কলিগ এসে বললো।
—- মিসেস নোভা, আপনাকে তাজরান স্যার ডাকছে।ফাইলগুলো সে একবার চেক দিবে।বুঝতেই তো পারছেন বিদেশি ক্লায়েন্টের বিষয়। কোন ভুল স্যার করতে চাইছে না।
আমিঃ আপনি কি একটু নিয়ে যেতে পারবেন?
—- আপনাকেই যেতে হবে নোভা।আপনার ফাইল আমি নিয়ে গেলে স্যার চটে যেতে পারে। তাছাড়া কোথাও ভুল হলে সেটাও তো শুধরে দিবে।সেটা সরাসরি আপনাকে দিলেই ভালো হবে।এতে আপনি আপনার ভুলগুলো বুঝতে পারবেন।পরবর্তীতে আর এরকম ভুল করবেন না।প্লিজ, কিছু মনে করবেন না।স্যার যেহেতু আপনাকে যেতে বলেছে সেহেতু আপনাকেই যেতে হবে।
আমিঃ ওহ্ আচ্ছা। শুকরিয়া বুঝিয়ে বলার জন্য।
— আপনাকেও।
আমার কলিগ চলে গেলো।আমি ফাইলগুলো গুছিয়ে চুপ করে বসে রইলাম।মনের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে। একবার ভাবি যাবো,আরেকবার ভাবি এর সামনে ভুলেও যাবো না। অবশেষে মনকে রাজি করিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিলাম।বাইরে আসতেই ঝড়ের গতিতে কেউ একজন দৌড়ে যেতে নিলে তার সাথে ধাক্কা খেয়ে ফাইলগুলো পরে যায়।সামনে তাকিয়ে দেখি ২২ বা ২৩ বছরের একটা যুবতী মেয়ে। আমার দিকে না তাকিয়েই ফাইল তুলতে বসে পরে।
—- আই এম সো সরি।আমি আসলে খেয়াল করিনি। প্লিজ কিছু মনে করেন না।
কথাগুলো বলতে বলতে তাড়াহুড়ো করে ফাইল তুলতে লাগলো।তারপর ফাইলগুলো আমার হাতে দিয়ে আবার সামনের দিকে দৌড় দিলে।অথচ সে আমার দিকে একটুও তাকায়নি।মনে হচ্ছে খুব তাড়ার মধ্যে আছে। আমি তার কান্ডে মুচকি হাসলাম।তারপর ধীর পায়ে তাজের কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।দরজা খুলে ভেতরে তাকাতেই চমকে উঠলাম।ঐ মেয়েটা তাজকে জড়িয়ে ধরে আছে।তাজের এক হাত ওর মাথায়।তারপরের ঘটনা তো জানাই আছে সবার।
ফ্লাশব্যাক এন্ড…………..