আমার কথা শুনে তায়াং ভাইয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো।হাত মুঠ করে সে রাগ কন্ট্রোল করছে।কপালের রগ ফুলে উঠেছে। আমি ওর হাতের ওপর হাত রেখে বললাম।
আমিঃ শান্ত হো ভাই।তুই এত রাগছিস কেন?
তায়াংঃ ওর এতবড় সাহস কি করে হতে পারে?ওর বউ থাকতে অন্য মেয়ের সাথে কিসের এতো ঢলাঢলি?তুই এর জন্য কাঁদছিলি। তোর চোখ দিয়ে গত আড়াই বছর ধরে শুধু পানি ঝড়াচ্ছে।আর আমি রাগবো না। ওকে আমি ছাড়বো না। জিন্দা কবর দিবো।ওর সমস্যা কি?
আমিঃ আমিও জানি না। ওর ফ্যামেলীর খোঁজ নিয়েছিস?
তায়াংঃ হুম।
আমিঃ আমার দিকে তাকা।তুই এখন না রেগে ওর বায়োডাটা বলতো আমায়।
তায়াংঃ আমার এখন বলার মুড নেই।
আমিঃ প্লিজ ভাই বল না রে।
তায়াংঃ হু বলছি।
তায়াং ভাইয়া নিজেকে কিছুটা ঠান্ডা করে আমার দিকে ঘুরলো।ওর চোখ দুটো অসম্ভব লাল হয়ে গেছে। এখন তাজকে সামনে পেলে যে দু-চার ঘা উত্তমমধ্যম দিতো তা আমি জানি।
তায়াংঃ তাজই এনাজ।কারণ এই তাজের নাকি বছর দুই আগে একটা বড় এক্সিডেন্ট হয়েছে।ওদের ফ্যামেলীতে যারা আছে তারা এক বছর আগে এই নতুন বাসায় উঠেছে। তাদের আগের বাসা কোথায় তা কেউ বলতে পারে না। আশেপাশের লোকের থেকেও কোন খবর নিতে পারিনি।তবুও অনেক কষ্টে তাজের পালিত বাবার এক বন্ধুর খবর জোগাড় করেছিলাম।সে প্রথমে তাজের বিষয় মুখ খুলতে চায়নি।পরবর্তীতে অনেক কষ্টে তার মুখ খুলতে পেরেছি। সে জানালো তাজ নাকি মুরাদ সাহেবের ছেলে নয়।আড়াই বছর আগে তাজকে পেয়েছে। তারপর ওর চিকিৎসা করিয়ে নিজের ছেলের পরিচয়ে তার সাথেই রেখে দিয়েছে। তাজ যে তার ছেলে নয় সেটা জেনো কেউ জানতে না পারে তার জন্য বাসাও পাল্টে ফেলেছেন।
আমিঃ কিন্তু কেন? একটা অচেনা, অজানা ছেলের জন্য এতকিছু তারা কেন করবে? কোনভাবে ঐ মুরাদ সাহেব কোন স্বার্থের কারণে তাজকে ব্যবহার করছে না তো। আমার কিন্তু বিষয়টা গন্ডগোল মনে হচ্ছে।
আমার কথা শুনে তায়াং ভাইয়া কপাল কুঁচকে আমাকে বললো।
তায়াংঃ কথাটা তো মন্দ বলিস নি।আমি তো এমন করে ভেবে দেখিনি।
আমিঃ দেখ ভাইয়া, আমার মনে হচ্ছে এনাজ নিশ্চয়ই বড় কোন বিপদে আছে।নয়তো কেউ ওকে কোন স্বার্থ ছাড়া কেন নিজের ছেলে পরিচয়ে বড় করবে? যদি মুরাদ সাহেব স্বার্থ ছাড়াও ওকে নিজের ছেলে পরিচয়ে রাখে তাহলে এনাজ কেন এতদিন আমাদের কাছে ধরা দেয়নি? এটাও কিন্তু ভাবার কথা।
তায়াংঃ আচ্ছা চল , আমরা আগামীকাল ঐ বাসায় যাই।যদি তোর কথা তাজ ওর বাসার সবাইকে বলে তাহলে তারা তোকে চিনে ফেলবে।যদি কোনভাবে কোন ক্লু পেয়ে যাই তাজ কেন এতদিন আমাদের সামনে আসেনি।কিংবা ও কোন বিপদে আছে কিনা।
আমিঃ হুম তাই চল।কাল তোর সময় হবে?
তায়াংঃ তোর কাজের জন্য আমি সবসময় ফ্রী। যদিও একটু কাজ আছে। তবে সমস্যা নেই। পরে করে নিবো।
আমিঃ বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হবো।মাথা ঘুরাচ্ছে।চল আমাকে দিয়ে আয়।
তায়াংঃ আচ্ছা চল।
প্রথমে এনাজের ওপর ক্ষোভ থাকলেও এখন সেটা নেই।কেন জানি মনে হচ্ছে এনাজ হয়তো কোন সমস্যায় আছে।নয়তো আমার কাছ থেকে এতদূরে তো সে কখনোই থাকবে না। আর মেয়েটাই বা কে হতে পারে। সেই তথ্য খুঁজতে এখন আমাকে তাজের বাসায় যেতেই হবে।তায়াং ভাইয়া প্রথমে রাগলেও এখন পুরো স্বাভাবিক আছে। ভাইয়ার বাইকে উঠতেই সে স্টার্ট দিলো।
🦋🦋🦋
বাসার কোলিংবেল বাজাতেই পাশের বাসার এক চাচী এসে দরজা খুলে দিলো।তার হাত ধরে নাভানও এসেছে।আমাকে দেখে নাভান ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।আমি ওর কপালে চুমু খেয়ে কোলে তুলে নিলাম।চাচীকে আমাদের বাসায় দেখে বেশ অবাক হলাম।হিমিও ততক্ষণে আমার সামনে চলে এসেছে।
হিমিঃ এত তাড়াতাড়ি ফিরে আসলি যে?
আমিঃ ভালো লাগছিলো না।তাই চলে এলাম।
হিমিঃ ওহ্।ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি কিচেনে একটু আয়।আমি একা এতকিছু সামলাতে পারবো না। কতকিছু রান্না বাকি আছে এখনো।আমি একটু পর তোকে এমনিও কল করতাম।
আমিঃ কেন?বাসায় কি কেউ এসেছে? ছেলেদের জুতা দেখলাম বাইরে? এই সময়ে কে এসেছে? চাচীও আমাদের বাসায়।ঘটনা কি?
নাভানঃ এট্টা(একটা) আন্কেল এসছে।
আমিঃ কোন আঙ্কেল বাবা?
নাভানঃ আমি চিনি না।
আমিঃ ওহ্।তুমি তাকে কখনো দেখছো?
নাভানঃ না দেখি নাই।
আমিঃ ওহ্।
নাভানঃ জানো আম্মু,আমাল (আমার) জন্য এত্তগুলা তকলেট(চকলেট) আনছে আন্কেলটা।আমরে অনেক আদর করছে।
নাভানের কথা শুনে আমি হিমির দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম।
হিমিঃ এরিন কোন একটা ছেলেকে নিয়ে এসেছে। আমি তাকে চিনি না। চাচীকে আমিই ডেকেছিলাম।পোলাও রান্নায় পানির পরিমাণটা আমি বুঝি না।তাই তাকে ডেকে আনলাম।মেহমান এসেছে তার জন্য তো ব্যবস্থা করতেই হয়।তুই যখন এসে পড়েছিস তাহলে আর কোন চিন্তা নেই।
আমিঃ ওহ আচ্ছা।
আমি চোখ, মুখ কুঁচকে ফেললাম।এরিন আবার কোন ছেলেকে বাসায় এনেছে। কোনভাবে সেটা রোশান তো নয়।রোশানকে তো হিমি চিনে না। যেদিন রোশান আমাদের বাসায় এসেছিলো সেদিন হিমি ঘুম থেকে উঠার আগেই রোশান চলে গিয়েছিল।যার কারণে রোশানকে হিমি দেখেনি।আমি জুতা জোড়া দরজার পাশে রেখে নাভানকে নিয়েই ভেতরে ঢুকলাম। নাভান শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।হিমি আর চাচী কিচেনে চলে গেল।
আমিঃ আমার নাভান সোনা কি ঠিকমতো খাবার খেয়েছে?
নাভানঃ হুম।
আমিঃ খালামণিদের কে জ্বালাওনি তো আজকে?
নাভান এক চোখ বন্ধ করে ডান হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে এক চিমটি পরিমাণ দেখিয়ে বললো।
নাভানঃ এট্টু জ্বালাইছি।
ওর কথা বলার ভঙ্গিমা দেখে আমি হেসে উঠলাম।একদম বাপের মতো কান্ড করে। এর হাসি দেখলেই আমার সারাদিনের ক্লান্তি শেষ। এই নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে আমি সব ভুলে যাই। মাঝে মাঝে রাগের বশে একে মারলেও পরে কলিজা ছিঁড়ে যায়।তারপর জড়িয়ে ধরে যখন কান্না করি,তখন বড় মানুষের মতো ছোট ছোট হাত দুটো বাড়িয়ে আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে, “আম্মু কাঁদে না”। তখন কেন জানি নিজেকে অনেক সুখী মনে হয়। আমার ছেলে তো আমাকে বুঝে।ও থাকলেই হবে আমার।আর কাউকে লাগবে না।
নাভানঃ আম্মু তকলেট খাইবা?আমাল অনেক গুলো তকলেট আছে।তোমাকে দিবোনি হে।
আমিঃ আচ্ছা বাবা।গোসল করছো?
নাভানঃ না।
আমিঃ আমরা এখন গোসল করবো তাহলে।বলো ওকে। ওকে বলো।
নাভানঃ না।
আমিঃ ছি: বাবাই।গোসল না করলে তো সবাই তোমাকে পঁচা ছেলে বলবে।সবাই কি বলবে জানো?
নাভানঃ কি?
আমিঃ সবাই বলবে নাভান নোংরা ছেলে। ঠিকমতো গোসল করে না।গোসল শেষ হলেও তো বাথটাব থেকে উঠতে চাও না।আর এখন গোসল করতে মানা করো কে? চলো, চলো, আমরা জলদী জলদী করে গোসল করে আসি।তোমাকে গোসল করিয়ে আম্মু কিচেনে যাবে কাজ করতে।ততক্ষণ তুমি গুড বয়ের মতো করে থেকো।নয়তো ঐ আংকেলটা তোমাকে কি বলবো জানো? বলবে নাভান বেড বয়।তোমার সাথে আর কথা বলবে না। তোমার জন্য চকেলটও আনবে না।পাশের বাসার নীরবের জন্য আনবে।কিন্তু তোমাকে দিবে না। তখন কি ভালো হবে বলো।
নাভানঃ না আমাকে দিবে।
আমিঃ তাহলে তো তাড়াতাড়ি গোসল করতে হবে।গোসল করে আমার বাবা সুন্দর প্যান্ট-শার্ট পরবে।তাহলে সবাই আমার বাবাইকে ভালো বলবে।ইয়েহ,কি মজা!!! গোসল করলে কেউ আমার বাবাইকে বেড বয় বলতে পারবে না। চলো হাইফাইভ করি।হাত দেও জলদী করে।
নাভান হাসিমুখে ওর ছোট হাত বাড়িয়ে দিলো।আমি ওর হাতের সাথে আমার হাত মিলিয়ে দিলাম।এতে সে আরো খুশি হয়ে আমার গালে চুমু খেলো।
আমিঃ আমার বাবা এখন গোসল করবে তাই না?
নাভানঃ হুম।নাভান গুসুল করবে।
আমিঃ ওকে চলো তাহলে।
নাভানঃ ওকে।
নাভানের সাথে সোফায় বসে একদফা কথা বলেলাম।আজকাল ছেলেটাকে সময়ই দিতে পারি না। সোফা থেকে উঠে নিজের রুমে যাওয়ার আগেই অপর রুম থেকে এরিনের ডাক আসলো।ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও সেদিকে পা বাড়ালাম।
এরিনঃ নোভা এদিকে আয়।দেখে যা কে এসেছে?
আমি ধীর পায়ে পর্দা সরিয়ে রুমে ঢুকলাম। এরিন খুশি মনে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললো।
এরিনঃ দেখ কে এসেছে?
আমিঃ কে?
এরিন সামনে থেকে সরতেই আমি সেই মানুষটাকে দেখতে পারলাম।তাকে দেখেই আমি অবাক।সেও যে আমাকে দেখে অবাক হয়েছে তা তার চোখ, মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আমি অবিশ্বাস্য চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছি। এ এখানে কি করছে???