গুণগুণ সুরে মুখরিত দুআর কামরা।হাত চালিয়ে রুমের শোভা বর্ধনের কাজে ব্যস্ত থাকা দুআ মিনমিন সুরে গানের পসরা সাজিয়েছে।এই গানের সুর তোলার পাশাপাশি দুআর কল্পনার রাজ্যে শুধু ইয়াদের ছবি আঁকছে মেয়েটা। আঁকবে নাই বা কেনো?মেয়েটার প্রেমিক পুরুষ যে ইয়াদ!এই কয়দিনে যতবার,যতক্ষণ,
যতো প্রহর ইয়াদের সাক্ষাৎ হয়েছিল, ইয়াদ সর্বক্ষণ মেয়েটাকে হারে হারে বুঝিয়ে দিয়েছিলো,ইয়াদের জন্যে “দুআ” হলো একরাশ ভালোবাসার নাম।খেলোয়াড় লোকটার যত্ন,দুআর খুঁটিনাটি ব্যাপারে খেয়াল রাখা,
দুআর প্রতি তার দায়িত্ববোধ,দেখা হলে আগলিয়ে রাখা,ভালোবাসাময় কিছু বাক্য নিবেদন,স্নেহশীল চাহনী, ভরসাময় উক্তি,সব কিছু দুআর মনে স্থায়ী হলো যেনো।
এইসবের জন্যেই তো আজকাল দুআ বড্ড ব্যকুল থাকে,কবে খেলোয়াড় লোকটার এমন পাগলামিতে শামিল করবে নিজেকে!দুআর ধারণা,দুআর রাজ ভাগ্য বলেই মেয়েটা এমন একজন প্রেমিক পুরুষ পেয়েছে।যে তার সবকিছুকেই ভালোবাসে।হোক সেটা দুআর নজর কাড়া রূপ বা দাগযুক্ত চামড়া!মেয়েটা ইয়াদের এমন ভালোবাসা দেখেই এখন মরিয়া হয়ে থাকে,কবে আবারও সাক্ষাৎ পাবে সে প্রেমিক পুরুষের?এমন প্রেমিক পুরুষের আহ্লাদী কর্মকাণ্ড কার’ই বা খারাপ লাগে?দুআ হেসে উঠলো আনমনে।লোকটা যখন চুপি চুপি সকলের আড়ালে তার হাতটা নিজের মুঠোয় নেয়,
তখনকার অনুভুতি দুআর সবচেয়ে প্রিয়,অতিপ্রিয়।সেই স্পর্শে থাকে না কোনো কামুকতা,থাকে শুধুই প্রেয়সীকে একটিবার ভালোবাসার ছোঁয়ায়,স্পর্শ করার আকাঙ্খা।
লোকটাকে মাঝে মাঝে দুআর পাগল বলেই মনে হয়।নাহলে, নিশিরাতের বেলায়ও লোকটা দূরের ল্যাম্প-পোস্টের নিচে এসেও হাজির হয়,একনজর তাকে দর্শনের সুবাদে। যদিও তখন ইয়াদের চারদিকে তার কাজিন মহল উপস্থিত থাকে,তবে ইয়াদের নজর স্থির থাকে ঠিক জমিদার বাড়ির পূর্ব দিকেই।
ইয়াদের কড়া মেসেজের সম্মুখীন হয়ে মেয়েটা রাতের নিদ্রাকে বিদায় দিয়ে প্রেমিক পুরুষের জন্যে খোলা জানালায় উকি ঝুঁকি দেয় সঙ্গে সঙ্গে।নিদ্রা কাটতেই, দুআর নজরে তার খেলোয়াড়ের অবয়ব দৃশ্যমান হয়।লোকটার অবয়বের সাথে তার হাতের ধোঁয়া নিঃসরণ করা সিগারেটও দুআর নজর থেকে বাদ যায় না।
লোকটা যেনো আস্ত বিড়িখোর। কিন্তু,লোকটা সরাসরি কখনোই দুআর সম্মুখে, অধরে সিগারেটের আনাগোনা রাখে না।
মধুর স্মৃতি আজ দুআর মস্তিষ্কে টগবগ করছে।কিছুতেই যেনো তারা বিদায় জানাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিলো।
তবে, তার স্বপ্নরাজ্য ব্যাঘাত হলো মায়ের ডাকে,
–“চাঁদ,জলদি তৈরি হয়ে আয়।”
এমন কথা শুনে দুআর স্বপ্নরাজ্য ভেঙে চুরচুর।
মস্তিষ্কের গভীর থেকে উঁকি দিচ্ছে একটাই কথা,
–“মাইশার হলুদে,তোমার কাছে কিছু চাইবো আমি।সেটা কিন্তু মানা করা দুষ্কর তোমার জন্যে।নিশ্চয়,ভালো কিছু চাইবো না।তাই আগে থেকে নিজেকে প্রস্তুত করে রেখো,চন্দ্র।”
শেষবার ইয়াদের সাথে দেখা হলে উপরোক্ত কথাটি দুআর কানে ফিসফিসিয়ে বলেছিল ইয়াদ।ছেলেটা সেদিনও প্রেয়সীর কপালে অধর ছোঁয়াতে গিয়েও পিছু হটেছিল।কারণ একটাই,দুআ।ইয়াদের মতে,ইয়াদ হুট করে যদি এই কাজ করে তবে দুআ কিছুতেই তার সামনে ধরা দিবে না,প্রাণ গেলেও না।তাই আগে থেকেই সতর্কবার্তা দিয়ে রেখেছে সে মেয়েটাকে।
কল্পনার রাজ্যে এতটাই বুদ ছিলো দুআ,সে ভুলতেই বসেছে আজ সন্ধ্যায় মাইশার হলুদ। অথচ সকালেই কাকিমা তাকে সুন্দর কলাপাতা রঙের জামদানি শাড়িটা পড়ে যেতে বলেছে।দুআ নির্দ্বিধায় তখন রাজি হলেও,পূর্বরক্তি ইয়াদের কথা ভেবে মেয়েটা তখনও লজ্জায় বুদ হয়েছিল।কিন্তু,হঠাৎ’ই প্রেমিক পুরুষের শক্ত বুলি কিভাবে যেনো ছুটে গিয়েছিল তার মস্তিষ্কের গহীন থেকে।
দুআর তনুতে তিরতির ভাব।তার ভাবলেশহীন ভাবভঙ্গি দেখে আহেলী পুনরায় বললো,
–“এই মেয়ে,কি হলো তোর! জেনি আসবে এখনই। সূর্য ডুবতে শুরু করেছে।ফটফাট তৈরি হ।তমাল আর জুঁই আসলে ওদের গাড়িতে উঠবি।আমাদের বাকি আত্মীয় যাবে নিজেদের গাড়ি করে।”
সংশয়ে ডুবন্ত দুআ মায়ের পানে তাকালো।প্রেমিক পুরুষের স্পর্শ পেতে তার মনটাও আনচান করে,কিন্তু এর পরবর্তীতে লজ্জার দরুণ দুআর হুঁশ খোয়াবে কিনা, এই নিয়েই মেয়েটার যতো দ্বিধা।মেয়েটার লাজের পরিমাণ গগণ স্পর্শী।
–“আম… আম্মা,আমি না যায় আজ?”
দুআর ভীত কণ্ঠ।
বাঘিনীর ন্যায় গর্জন শোনা গেলো আহেলীর দুআর কথার প্রত্যুত্তরে,
–“রিজোয়ান শুনলে কেলেঙ্কারি বাজিয়ে দিবে।ছেলেটা তার বিশ্বস্ত ভাইদের তোকে নেওয়ার জন্যেই উল্টোপথে আসতে বলেছে।কোনো কথা নয়।জলদি তৈরি হতে শুরু কর।”
–“মালকিন,আমি আইসা পড়ছি।”
জেনি কামরায় প্রবেশ করলো হাসিমুখে।
–“এইতো,ভালো করেছিস জেনি একেবারে তৈরি তুই।এইবার এই মেয়েকে শাড়ি পড়িয়ে চুলটা পরিপাটি করতে সাহায্য কর।”
আহেলী দুআর পানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে কামরা ত্যাগ করলো।
মনে শত লজ্জার আবরণ দমিয়ে রেখে দুআ চললো ওয়াশরুমে।ভেতরে একটাই প্রশ্ন পুনরাবৃত্তি করছে,
আজ খেলোয়াড় সাহেবের সম্মুখে লজ্জার ভারে জ্ঞান খোয়াবে সে?
যথারীতি সময়ে দুআ তৈরি হলো।দীঘল কালো কেশ পিঠের উপরেই সুন্দর করে ছড়িয়ে আছে।জেনি আবার কৃত্রিম ফুলের সুন্দর একখান গাজরা আটকে দিলো দুআর পেছনের চুলের ডান প্রান্ত থেকে বাম প্রান্ত পর্যন্ত। এতেই যেনো পরিপূর্ণতা পেলো দুআর সাজ।ব্লাউজের হাতার ডিজাইন আজ লম্বা হলেও বেশ বড় ঘের বিশিষ্ট। যার দরুণ,দুআ নিজের হাত উপরে না তোলার শত চেষ্টায় ব্যস্ত।ব্লাউজের এই ডিজাইন দুআর কম পছন্দ হলেও, মুখ খুললো না মেয়েটা।এই কথা শুনলে আহেলী নিশ্চয় আবারও তুলকালাম কান্ড ঘটাবে।নিজেকে সংযত করে সে সিদ্ধান্ত নিলো,খুব বেশি প্রয়োজনে দুআ হাত উপরে উঠাবে।নিজেকে পুনরায় আয়নায় পরখ করে নিলো সে।শাড়িতে তার রূপটাই যেনো বদলিয়ে ধারণ করলো এক পূর্ণ যুবতীর রূপ।দুআর স্বয়ং, নিজের এই রূপ কল্পনার চেয়েও বেশি পছন্দ হলো।স্বরূপ বিবেচনা মেয়েটা হাসলো খুবই চমৎকার ভঙ্গিতে।
গাড়ি এখনো পৌঁছায়নি।দুআ রিজোয়ানের হাত চেপে দাঁড়িয়ে রইলো আঙিনায়।গাড়ি আসলে দুই ফটক আপনাআপনি খুলে যাবে।দুইজন সচেতন দারোয়ান যে দরজার কিনারায় অবস্থান করছে।
–“কোনো সমস্যা হলে,ভাইকে ফোন দিবি। জেনি দুআর যেনো কোনো সমস্যা না হয়,খেয়াল রাখবেন তার।”
জেনি মাথা নাড়ালো নিশ্চুপ।দুআ তার ভাইয়ের পানে তাকালো,
–“আমি ছোট বাচ্চা না ভাইয়া।আর আমার কি বা সমস্যা হবে?”
–“সমস্যা হলে,মাইশা বা ইয়াদকে বলবি।ছেলেটা তোর অনেক খেয়াল রাখে।আমার চোখে সব আসে।আমি ছোট বাচ্চা না।”
রিজোয়ানের সোজাসাপ্টা উত্তর শুনে দুআর মনে আতঙ্ক ভর করলো।তার ভাই,অনেকবার দুআকে একা ছেড়েছে ইয়াদের সাথে।এর মানে,তার ভাই কি ইয়াদের ব্যাপারটা জানে?অবশ্য জানবে নাই বা কেনো,মাইশা হয়তো সুরসুর করে সবটা বলেছে রিজোয়ানকে ইয়াদের ব্যাপারে।তাই তার ভাই হয়তো,পরীক্ষা সুলভ দুআকে একা ছাড়তো ইয়াদের নিকট।কম স্থানে তো ভ্রমণে যায়নি তারা একসাথে!তখন হুটহাট সময়ের পূর্বে রিজোয়ানের আগমন না ভাবালেও, এখন দুআ বুঝতে পারছে,কেনো তার ভাই সময়ের পূর্বে তার কাছে ফিরে আসতো!
ভাই তলে তলে সবটা উম্মেচন করেছে,পর্যবেক্ষণ করেছে।অথচ অবুঝ দুআর তখন কিছুই বোধগম্য হয়নি।
দুআ নিশ্চুপ থাকলেও,মিটিমিটি হেসে যাচ্ছে জেনি।দুআ পুনরায় ভাইয়ের পানে তাকালে রিজোয়ান দুআর মাথায় হাত রাখলো সন্তর্পনে,
–“আমি জানি সব।ইয়াদ আমাকে বলেছে।”
কুঁকড়ে উঠলো দুআ।এই মুহূর্তে ভাইয়ের দৃষ্টি মেলানো তার জন্যে এভারেস্ট জয়ের মতোই।মৃদু কম্পিত ডান হাত চেপে ধরলো বাম হাত দিয়ে।ইয়াদের সাহসিকতা ঠিক কতটা প্রখর, তা বুঝতে বেগ পেতে হলো না দুআকে।তার সিংহের লাহান সাহসী ভাইকে কিভাবে তাদের প্রেমের সম্পর্কে জানিয়ে দিলো?দুআ ভাবনায় মশগুল।দুআর বলা হলো না কিছু।
গাড়ির হর্ন বাজতেই বিশাল ফটকের দুই দ্বার খুলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।রিজোয়ান সহসাই এগিয়ে যাচ্ছে।স্ফীত কণ্ঠে সে দুআকে বলে উঠলো,
–“ছেলেটাকে আমি ভালো করেই উপলব্ধি করেছি।আগের অভ্যাসের মাত্রার ছিটেফোঁটাও, তার মাঝে নেই এখন।খারাপ অতীতকে ভুলে সম্মুখে এগিয়ে চলা মানুষটার ব্যক্তিত্ব বজ্রের ন্যায়।ঢাকায় খোঁজ নিয়েছিলাম ইয়াদের,ছেলেটা বড্ড পরিবর্তন এনেছে নিজের বিগত কয় বছরে।এমন শক্ত ব্যাক্তিক্তের মানুষের চোখে তোর জন্যে প্রখর দায়িত্ববোধ দেখে আমি নাকচ করতে পারলাম না ছেলেটার প্রস্তাব।আমার ছোট দুআর জন্যে এই শক্ত পার্সোনালিটির মানুষটাই দরকার।সাবধানে থাকবি সেখানে।”
দুআকে আলিঙ্গন করলো রিজোয়ান।ছলছল আঁখিতে ভাইয়ের পানে দৃষ্টি জ্ঞাপন করলো সে।ভাইটা তার ব্যাপারে বাকিদের সতর্ক করতে ব্যস্ত।রিজোয়ান নামের ছেলেটা তার জন্যে আশীর্বাদ স্বরূপ।এমন ভাই সবার ভাগ্যে জুটে না।নিশ্চয়ই দুআর কপাল চাঁদ কপাল।তাই তো এমন একজন ভাই পেয়েছে সে,যে দুআর অগোচরে সবটা খেয়াল রাখে।
গাড়ি মাত্রই সামনে এগুচ্ছে।পেছনে বাক ফিরে দুআ দেখলো,জমিদার বাড়িতে কয়েকখানা বড় ট্রাক প্রবেশ করছে।এখন থেকেই বুঝি আগামীকাল রিজোয়ানের হলুদের অনুষ্ঠানের জন্যে কাজের ঢল নামবে।
ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে ঝলমলে জমিদার বাড়ি।