দুআ হাসপাতালে।মাইশার লেবার পেইনের কারণে কাকীমা এবং রিজোয়ানের সমেত হাসপাতালে এসেছে সে।যদিও দুআর নিজের শরীর ভালো নেই, তাও সে মাইশার এমন দুর্দিনে;নিজের ভালো খারাপ লক্ষ্য না করেই ছুটে এসেছে সকলের সাথে।মাইশা কাদঁছে প্রচুর।দুআর ভেতরকার অস্থিরতা বাড়লো হঠাৎ।দিন কয়েক পূর্ব হতেই তার ভেতরকার এমন অস্থিরতা তাকে গ্রাস করেছে।খানায় অনিয়ম,অতিরিক্ত তন্দ্রাসক্ত,ক্লান্ত শরীর,অসময়ে বমি এইসবের কারণে টলছে তার শরীর।
এই যে আজও,সকালে একটা রুটি কোনমতে তার পেটে পড়েছে আর অল্পটুকু পানি,ব্যস।এখন মেয়েটাকে খিদে জেঁকে ধরেছে।মাথাটাও ভারী।অপারেশন রুমে নেওয়া হয়েছে মাইশাকে।দ্রুত ডেলিভারির কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন তার। দুআর নিকট রিজোয়ান এবং কাকীমা বসে।কপালে জমে থাকা ঘামটুকু বারংবার মুচছে রিজোয়ান।ছেলেটা বড্ড চিন্তিত।
ভাইয়ের এমন মলিন মুখশ্রী দুআর সহ্য হচ্ছে না।ভাইকে
ভরসা দেওয়ার চেষ্টায় মেয়েটা ভাইয়ের হাতে হাত রেখে শুধালো,
–“সব ঠিক হবে ভাইয়া,চিন্তা করো না।”
–“ঠিক হতেই যে হবে,চাঁদ।আল্লাহ্ ভরসা।”
দুআ হাসার চেষ্টা করলো কেবল।অন্যরকম অস্থিরতায় তার তনু বড্ড ক্লান্ত।
ইয়াদের কথাটাও বেশ মনে পড়ছে তার।ছেলেটা দু সপ্তাহ পূর্বে এসেছিলো,আর আসেনি।জিয়ার বিয়ের তোড়জোড় চলছে।শুনলো,ক্রিকেট জগতেরই একজনের সাথে জিয়ার পরিণয়।একমাত্র ছেলে হওয়ার দরুণ,সবটা ইয়াদের সামলাতে হয়।সেদিনও মেয়েটা ছেলেটার বুক ভাসিয়ে বমি করেছিল তবে ডাক্তার দেখায়নি দুআ। ফুড পয়জনিং বলে ব্যাপারটা চেপে গিয়েছিল।তবে এখন সেই বমির পরিমাণ বেড়েছে,সাথে বেড়েছে অস্থিরতা।
দুআর আন্দাজ হয় কিছুর, তবে ভয়ে মুখ ফুটিয়ে বলছে না এক অক্ষর।পরিকল্পনা অনুযায়ী ইয়াদ এবং দুআর রিসেপশনের সময়কাল এখনো কয়েকমাস বাকি।এর পূর্বে দুআর এমন শরীর খারাপ,কে কিভাবে গ্রহণ করবে আয়ত্বে এলো না মেয়েটার।দুশ্চিন্তা হয় তার।দিন রাত,এই ব্যাপারটা নিয়েই মেয়েটা ভেবে যাচ্ছে।অথচ কেউ বুঝতেই পারছে না কিছু।মেয়েটা বুঝতেই দিচ্ছে না।
ইয়াদ রোজ ফোন করে।মেয়েটার চোখের নিচের দাগটাও তার নজর এড়িয়ে যায় না।তবে, পরীক্ষার কারণে পড়ালেখার চাপে এই বিষয়টা তেমন আমলে নেয় না ইয়াদ।পড়ালেখা সকলের জন্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।নির্দিষ্ট সময়ে আজও ইয়াদের ফোন এলো মেয়েটার মুঠোফোনে।চমকিত দুআ মুঠোফোন নিয়ে আড়ালে গেলো।সকলের সামনে লোকটার সহিত কথা বলতে তার বাঁধে।
ফোন রিসিভ হতেই দুআর দুর্বল কণ্ঠস্বর প্রবেশ করলো মানবের কর্ণ গহ্বরে,
–“বলুন।”
–“হুয়াট হ্যাপেন্ড,চন্দ্র?ভয়েস এমন শোনাচ্ছে কেনো?”
ইয়াদ বিচলিত।
–“আমি হাসপাতালে এসেছি,মাইশা আপু ওটিতে।”
–“মাইশার কথা বুঝলাম,তোমার স্বর এমন কেনো?কি হয়েছে?”
ইয়াদের কণ্ঠে অস্থিরতা।
–“কিছু হয়নি তো।আমি ঠিক..”
খানিক থেমে মেয়েটা পুনরায় বললো,
–“আমি ঠিক আছি।চিন্তা করবেন না।কবে আসবেন?”
–“তোমার কণ্ঠ যথেষ্ট দূর্বল শোনাচ্ছে।কান্নাকাটি করে এমন হাল করোনি তো?”
ছেলেটা আবারও প্রশ্ন করলো।
ইয়াদের বুলির পরপর মেয়েটার মাথায় চক্কর দিলো।খালিপেটে এইখানে ছুটেছিল মেয়েটা।এতো সময় পেটে কিছু না পড়ার দরুণ মেয়েটার অবস্থা পুনরায় সংকীর্ণ হয়।টলতে আরম্ভ করলো সে।ইয়াদ বিনা বিরতিতে প্রেয়সীকে নানান ফয়সালা শোনাচ্ছে।অথচ মেয়েটা তার ঝাপসা দৃষ্টিতে নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত। দূর্বল হাতের বাঁধন হতে নুইয়ে পড়লো মুঠোফোন।পরপর ফ্লোরে লুটিয়ে পড়লো দুআ।বসা অবস্থায় ফ্লোরে পড়াতে তেমন আঘাত পায়নি সে। তবে, তার এমন অবস্থায় আশে পাশের মানুষজন চিল্লাচিল্লি করলে দৌড়ে আসে রিজোয়ান এবং কাকীমা। তাদের মেয়েটা এইখানেই এসেছিল।
দুআকে নিচে শায়িত অবস্থায় দেখে কাকীমা চিৎকার করলো।সেই চিৎকারে ইয়াদের শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল ঘামটুকু বহমান।থরথর কাঁপছে অধর যুগল। কি হলো তার প্রেয়সীর?
থেমে থেমে ছেলেটা “দুআ” নাম বলে হাঁক ছাড়ছে। উত্তর আসছে না কোনো।ফোন কে’টে রিজোয়ানকে ফোন লাগানোর উদ্যোগ নেওয়ার পূর্বেই রিজোয়ান দুআর ফোন হতে উত্তর দিলো,
–“ইয়াদ?”
–“ভাইয়া,চন্দ্রের কি হলো?এই মিনিট তিনেক আগেও আমার সাথে কথা বলছিলো।”
ইয়াদ অস্থির।
–“জানিনা ইয়াদ।সেন্সলেস ও।ডক্টর দেখছে।চিন্তা করো না।হয়তো স্ট্রেসের কারণেই এমনটা হয়েছে।”
রিজোয়ান শান্ত ভঙ্গিতে বললো।
–“আমি বিকালের টিকিট কে’টে আসছি।ততক্ষণ একটু দেখে রাখবেন দুআকে।”
ইয়াদ পরপর উঠে দাঁড়ালো।
–“আচ্ছা আসো তুমি।”
রিজোয়ান তার বক্তব্য শেষ করলো।
ইয়াদ মুঠোফোন প্যান্টের পকেটে পুরে দ্রুত বেরুলো কক্ষ হতে।নিচে জিয়ার বাগদানের অনুষ্ঠানের সকল কিছুর ছড়াছড়ি।আত্মীয় স্বজনের অনেকেই এইখানে উপস্থিত।প্রথমত, দাঁড়ানো অবস্থায় সে অনলাইনে টিকিট বুক করলো চট্টগ্রামের যাত্রায়।ইয়াদকে দেখে অনেকে মিটিমিটি হাসছে।ইয়াদ সেথায় নজর দিলো না।অক্ষি গোলক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মা-বোনের সন্ধান পেলো রান্নাঘরে।সেথায় রামিসা এবং তার মায়ের উপস্থিতিও লক্ষণীয়।
–“আম্মি,আমি বিকালে চট্টগ্রাম যাচ্ছি।”
–“রাতে যাওয়ার কথা ছিলো,আব্বা।”
মায়ের কথায় ইয়াদ পুনরায় শুধালো,
–“দুআ অসুস্থ। মাইশাকে নিয়ে সকলে হাসপাতালে ছিলো।তখন সেন্সলেস হয়েছে মেয়েটা।”
–“হায় আল্লাহ্!কি হলো মেয়েটার?মাইশা কেমন আছে?”
–“মাইশা আপু ওটিতে,মামী।কিন্তু,দুআর কি হলো?”
বড্ড চিন্তিত রামিসা।
–“জানিনা,রামু। আম্মি,তুমি এদিকটা সব সামলিয়ে নাও।আমি কাল ফিরে আসবো দুআর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে।”
ইয়াদ রান্নাঘর হতে বেরুতে নিলে ডালিয়া থামালো তাকে,
–“দরকার নেই।মেয়েটা অসুস্থ কয়েকদিন থেকে আসো।একেবারে অনুষ্ঠানের দিন মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে আসবে।”
–“আচ্ছা।”
ইয়াদ প্রস্থান করলো।রান্নাঘরে উপস্থিত সকলের চেহারা বেজার।মনে মনে একটাই দোয়া করছে,দুই মেয়ে যেনো একেবারে সুস্থ থাকে।
‘
হতবিহ্বল দুআ।আঁখিতে পানি টুইটুম্বর। আহেলী নিষ্পলক মেয়ের পানে চেয়ে।দুআর মা হওয়ার খবর ইতোমধ্যে তিনজন জেনেছে। কাকীমা আহেলীকে দমিয়ে রাখলেন।মেয়ের এমন সুসংবাদ শুনেও জমিদারের কথা ভেবে আহত হচ্ছেন উনি।তার মেয়েটা ছোট, তবে ইয়াদ তো ছোট নয়!তার সকল জিদ মেনে নিলেও, জমিদারের একটা অনুরোধ কি ছেলেটার মেনে নেওয়া খুবই কঠিন ছিল?জমিদার এই ব্যাপারে শুনলে নিশ্চিত তুলকালাম বাঁধিয়ে দিবেন? আহেলী বড্ড চিন্তিত সাথে খুশিও।এহেন সময়ে এই খুশি প্রকাশ করতে পারছে না শুধু।
দুআ মাথা ঝুঁকিয়ে অশ্রু বিসর্জন করছে।মায়ের এমন অভিব্যক্তি দেখে ইয়াদের ব্যাপারে ভাবতেই তার রুহ কাঁপছে।দোষটা তার মা ইয়াদকে দিলেও,সত্যিকারের দোষ তার নিজেরই।জেনে শুনে মেয়েটার খামখেয়ালী পনায় ঔষধে হেলফেলের ফলাফল আজকের এই দিন।মায়ের রাগান্বিত চেহারার পানে আরেক নজর চেয়ে দুআ ক্ষীণ কণ্ঠে আওড়ালো,
–“দোষ আমার আম্মা,উনার না।”
–“চুপ একদম।তোর বাপ শুনলে কষ্ট পাবেন না, বল?”
আহেলীর কণ্ঠ তেজী।
–“উনি আমাকে সব ঔষধ বুঝিয়ে খাওয়ান।আমার খামখেয়ালীর কারণে এমনটা হয়েছে।”
আহেলী কটমট করে তাকায়।
–“এই ছোট বউ,তুই এমন করছিস কেনো মেয়েকে?মেয়েটা তো বাচ্চা না।আর না ইয়াদ বাচ্চা! তাদের ব্যাপার তারাই বুঝবে।বাদ বাকি,ইদ্রিস বুঝে নিবে সবটা।তোকে আর নাটক করতে হবে না।”
আহেলী দমলো কাকীর কথায়।
তবে দুআ থেমে নেই।ইয়াদের অভিব্যক্তি সম্পর্কে দুআ স্পষ্ট ধারণা করতে পারছে।লোকটা হয়তো আর কথা বলবে না তার সহিত।
ওড়নার কিনারে চোখ মুছলো মেয়েটা।
ইয়াদের সাথে কথা বলেনি দুআ।মোবাইল সুইচড অফ করেছে সে।ভয়ে তার হাত পা অসাড়।ঘড়ির কাঁ’টায় রাত আটটা।ইয়াদ বিকালে আসবে বলেও এখনো কেনো এলো না এই নিয়েও তার ব্যাপক সংশয়।বাড়ির সকলকে দুআর ব্যাপারে ইয়াদকে কিছু জানাতে নিষেধ করেছে দুআ।অগত্য মেয়েটা নিজেও জানেনা,ইয়াদের খবরাখবর।
আপাতত সে ইয়াদের ভয়ে।মেয়েটা ছেলেটার অভিব্যক্তির ব্যাপারে একেবারে বেখবর।