দুটি হৃদয়ের শেষ আশ্রয়

10 মিনিট পড়া 1,443 শব্দ
দুটি হৃদয়ের শেষ আশ্রয়

মেজো ফুপু মারা গেছেন ১ সপ্তাহ হলো। ও খুব চুপচাপ হয়ে গেছে। ও কখনওই বেশি কথা বলতো না।যাও একটু বলতো ফুপুর মারা যাবার পর আরো বেশি চুপচাপ হয়ে গেছে। যন্ত্রের মতো ওর জীবন হয়ে গেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল, ব্রাশ করে নাস্তা করে অফিসে যায়, রাতে ফিরে এসে রাতের খাবার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে।

খুব জরুরি না হলে আমার সাথে কথা বলেনা। আমরা আগের পুরাতন বাড়িতে থাকি না। ওর অফিসের পাশে একটা দোতলা বাড়ির দোতলার পশ্চিম দিকের ফ্ল্যাট টা ভাড়া নেয়া হয়েছে।

একটা কাজের মেয়েই আমার কথা বলার সংগী।

পুরো ১ টা সপ্তাহ ও এভাবেই কাটালো। জানি না আর কতো সপ্তাহ এভাবে কাটাবে।

আমার নিজের মধ্যে খুটে খুটে মরছি আমি। বারবার মনে হচ্ছে, ওর মায়ের মৃত্যুর জন্য ও আমাকে দায়ী করেছে। আমি কিছু বলতেও পারছিলাম না আবার সহ্যও করতে পারছিলাম না।

পুরো ২ টা মাস কেটে গেলো ও আমার সাথে তেমন কথাও বলেনা। এমনকি আমার হাতটাও ও স্পর্শ করেনি। আমি যেচে কথা বলতে গেলে ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর উত্তর দেয়। তাও খুব সংক্ষিপ্ত।

আমার যাওয়ার মতো জায়গাও খুঁজে পাচ্ছিনা। আফরোজার সাথে দেখা করা দরকার। ও হয়তোবা আমাকে কোনো সেফ জায়গা খুঁজে দিতে পারবে। সৌরভ আমাকে একদমই পছন্দ করছে না। ও আমাকে চলে যেতে বলতেও পারছেনা।

আফরোজার নাম্বারে ফোন দিলাম। ও রিসিভ করলো। আমি বললাম

– আফরোজা, ভালো আছিস?

– আরে শারলিন। আমি ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?

– আমি ভালোই আছি।

– মিথ্যে কেনো বলছিস? কী হয়েছে বলবি?

– তোর আজ বিকালে সময় হবে?

– হ্যা হবে। বাসায় আয়।

– না। কোনো একটা রেস্টুরেন্ট হলে ভালো হয়।

কোন রেস্টুরেন্ট এ দেখা করবো, কটায় সব ঠিক করে মোবাইল চার্জে দিয়ে রাখলাম। মনে মনে ছক কেটে ফেলেছি। আপাতত ছোটোখাটো কোনো চাকরী করবো। পড়াশোনাটাও চালিয়ে যাবো। একটা হোস্টেল হলে ভালো হয়।

বিকালে বের হলাম, কাজের মেয়েটাকে বলে গেলাম। ভাইয়া বাদে অন্য কেউ আসলে দরজা খুলবে না।

আমি পৌছানোর আগে আফরোজা এসে রেস্টুরেন্টের কোণার একটা টেবিলে বসে আছে।

আমাকে দেখে আফরোজা চমকে উঠে বলল

– তোর এই অবস্থা কেন?

– বুঝলাম না।

– তোর চেহারা দেখেছিস? শরীরের হাড় গোড় বের হয়ে গেছে।

আমি নিজেও খেয়াল করিনি। এই ২ টা মাস শুধু সমাধান খুঁজেছি পাইনি। আমি মৃদুস্বরে বললাম

– আমাকে একটু সাহায্য করতে পারবি?

– বল, সাধ্যের মধ্যে হলে করবো।

– আমাকে ছোটোখাটো একটা চাকরী খুঁজে দে না। আমার পেট চলে যাবে এরকম।

– হ্যা, তা পারবো কিন্তু কী হয়েছে বলবি?

চোখের কোণায় কয়েক ফোটা পানি জমে আছে। গাল বেয়ে পরে গেলো। ওড়না দিয়ে মুছে বলতে শুরু করলাম। ও গম্ভীর স্বরে বলল

– ভালো করেছিস। তবে চাকরি টা পেতে সময় লাগবে। ধর ২-৪ দিন। তুই এই কদিন তোর বরের সাথে থাক। আমি তোকে জানাবো।

বাসায় আসার পর একটু সাবধানে থাকতে শুরু করলাম। ও যেন কোনোভাবেই বুঝতে না পারে সেদিকে বেশি সতর্কতা বজায় রাখলাম।

মনে মনে ছক কেটে রাখলাম কী কী নিবো। আমার অবশ্য বেশি জামাকাপড় নেই।

আমার তো কোনো দোষ নেই। ও আর ওর মা আমাকে নিয়ে খেলেছে।

নীল কে ছেড়ে যেতে আমার খারাপ লাগবে কিন্তু আমাকে বাঁচতে হবে।ওর প্রতি আমার মনে ভালবাসার পাশাপাশি ঘৃণাটাও জন্ম নিয়েছে।

এগুলো ভাবছিলাম আর বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিলাম। কলিংবেল বেজে উঠলো। মেয়েটা দরজা খুললো। তারপর হাসি মুখে মেয়েটা এসে বলল

– আপামনি, আপনার বড় ফুপু এসেছেন।

বড় ফুপু আমাকে দেখে প্রথমে একটু চমকে গেলেন। তারপর আমাকে বললেন

– শারলিন, একটু দাড়া তো।

আমি দাঁড়ালাম। বড় ফুপু আমাকে ঘুরেঘুরে দেখছেন। তারপর পেটে হাত দিয়ে কী যেন বুঝার চেষ্টা করলেন। তার মুখে হাসির ঝিলিক লেগে গেলো। আমাকে বললেন

– সৌরভ টা কখন আসবে?

– রাত হবে।

– হতচ্ছড়াটা একটু খেয়ালও রাখে না তোর। আজকে আসুক আমার ভাস্তির এই হাল করে রেখেছে। এর শোধ আমি তুলবো।

আমার এখন আর এসব চিন্তা মাথায় আসছে না। মাথায় শুধু ঘুরছে কীভাবে চলে যাওয়া যায়? ও অবশ্য আমাকে খুঁজবে না। তারপর ও যদি খোজার চেষ্টা করে তাহলে যাতে আমাকে খুঁজে না পায় সেই চেষ্টা করতে হবে।

বড় ফুপু বললেন

– রান্না করা আছে?

– হ্যা আছে।

– ওগুলো ফ্রিজে রেখে দেই। বিরিয়ানি রান্না করি। সবাই মিলে একসাথে খাওয়া যাবে।

– কী কী গুছিয়ে দিতে হবে বলুন?

– তুই রেস্ট নে।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। এই সংসার এর প্রতি আমার কোনো বিন্দুমাত্র মায়া নেই। আমার মন চাচ্ছে এখনি পালাই।

বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙলো বড় ফুপুর ডাকে। আমাকে টেনে তুলে হাত মুখ ধুইয়ে খাবার টেবিলে নিয়ে গেলো। সৌরভ যে চেয়ার টাতে বসেছে আমাকে তার মুখোমুখি চেয়ার টাতে বসিয়ে দিলো।

কাজের মেয়ে আর বড় ফুপু পাশাপাশি বসলেন।

বিরিয়ানি বরাবরের মতোই ভালো হয়েছে।খুব তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছিলাম। একটা বারের জন্যেও ওর দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছেনা। বড় ফুপু ওকে বললেন

– শারলিন অসুস্থ সেটা কি তুই জানিস?

ও বলল

– জানি না। ওসব দেখার সময় আমার নেই।

– তাহলে বিয়ে কেনো করেছিলি?

– আমার মাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্যে।

কথাগুলো আমার গায়ে কাটার মতো ফুটছিলো। বাসররাতে যা যা বলেছিলো সব মিথ্যে?

ফুপু বললেন

– তুই জানতি, মেজো কখনওই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে না। আর ফিরিয়ে আনার জন্য ওকে বিয়ে করাটা জরুরী ছিলো না।

– কী বলতে চাচ্ছো?

– ও তোর স্ত্রী। আর তোর মায়ের মারা যাওয়ার কারণ অবশ্যই ও না।

– জানি কিন্তু আমার ওকে অসহ্য লাগে এখন।

– তাহলে ওকে বের করে দিলেই পারিস।শুধুশুধু ওকে আটকে রেখেছিস। ওর জীবন এখনো অনেক বাকি। এতো সুন্দর মেয়েকে যে কেউ বিয়ে করতে রাজি হবে।

– ওকে আমি আটকে রাখিনি।

কথাটা শুনে আমার মেজাজ বিগড়ে গেলো। রাগেগরগর করে বলে ফেললাম

– আমি ইনশাআল্লাহ আগামী ২-৪ দিনের মধ্যে চলে যাবো।

ও কিছুই বলল না। বড় ফুপু বললেন

– বাচ্চা পেটে নিয়ে একা থাকা যায়না।

কথাটা শুনে আমি হেসে বললাম

– বাচ্চা কোথা থেকে আসবে।

বড় ফুপু বললেন

– তুই প্রেগন্যান্ট শারলিন। এই অবস্থায় তো রেস্টে থাকতে হয়। আর তুই এমনিতেই অসুস্থ।

– এটা সম্ভব না। আমি প্রেগন্যান্ট না। আপনি শুধুশুধু ভাবছেন। আমাকে সংসারে রাখার জন্য আপনি মিথ্যে বলছেন।

– বিশ্বাস না করলে, ডাক্তারের কাছে গিয়ে চেকাপ করিয়ে নিস।

সৌরভ বলল

– ওকে আমার সহ্য হয়না আর তো ওর বাচ্চাকে। হেহ, ওকে বলো চলে যেতে। আমার ওকে প্রয়োজন নেই।

বড় ফুপু চলে গেলেন। বেডরুমের জানালা ধরে রাতের তারা ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি আমি কি সত্যি মা হবো?

যদিও বা হই তাহলে আমার সন্তানকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হবে। আমি তো সামান্য ইন্টার পাশ। আমার চাকরী হলেও খুব খারাপ নিম্নমানের হবে। ওকে আমি ভালো খাবার, ভালো পোশাক দিতে পারবো না কিন্তু ওকে অনেক ভালবাসতে পারবো। অনেক ভালবাসবো, আমার নিঃসংজ্ঞতা কাটানোর ওই তো একজন হবে।

নাকে সিগারেটের ধোয়া এসে লাগলো। পিছনে তাকিয়ে দেখলাম, সৌরভ চেয়ারে বসে সিগারেট টানছে। আমি মৃদুস্বরে বললাম

– আমার কষ্ট হচ্ছে। বাইরে গিয়ে ধূমপান করো।

ও সিগারেট টা ফেলে দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসলো। আমার অসহ্য লাগছে। ও আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। আমার শরীর ঘিনঘিন করতে লাগলো। আমি বললাম

– দূরে থাকো।

– অনেকদিন দূরে থেকেছি এখন পারছিনা।

– অন্য কাউকে নিয়ে আসো। তারপর তার গা ঘেঁষে দাঁড়াবা।

– বউ থাকতে অন্য নারীর কাছে যাওয়াটা ঠিক হবেনা। আর আমার তোমাকে ছাড়া অন্য মেয়ের প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই।

ভাবছো ওসব কেনো বললাম?

আসলে মনের ভিতরের চাপা রাগটা ঝেড়েছি।

– আমি ঘুমাবো এখন।

– অনেক ঘুমিয়েছো তুমি। তুমি চলে যাওয়ার প্ল্যান করছো তাই না?

– হ্যা। আমার তো কোনো প্রয়োজন নেই তাই।

– শুনো শারলিন, আমার কাছ থেকে দূরে যাওয়ার একটাই উপায় আছে সেটা হচ্ছে তোমার মৃত্যু। তুমি যতদিন জীবিত আছো ততদিন আমার সাথে তোমাকে থাকতে হবে।

আর খাবার টেবিলে ওসব কথা বলেছি, যাতে তোমার চলে যাওয়ার কথাটা তুমি নিজের মুখে স্বীকার করো।

আমি কাঁদতে শুরু করলাম। ও বলল

– প্রেগন্যান্ট অবস্থায় মেয়েদের হাসিখুশি থাকতে হয়। তাহলে বাচ্চাও হাসিখুশি থাকে, সুস্থ থাকে।

– আমি প্রেগন্যান্ট?

– হ্যা, সেটা তো আমি অনেকদিন আগেই বুঝতে পেরেছি কিন্তু বলা হয়নি। নিজেকে ঠিক করতে করতেই দেরি হয়ে গেলো।

– আমাকে নিয়ে ভাবতে হবেনা তোমার।

– আমার ভাবতে হবেই। কারণ আমার জীবন এখন তোমাকে ঘিরেই। মাকে খুব ভালবাসি তাই তার মৃত্যুতে খুব ডিপ্রেশনে পরে গিয়েছিলাম। তাছাড়া কিছুই না। আফরোজা আমাকে সব বলেছে। প্রথমে আমি বিশ্বাস করতে চাইনি। পরে ও তোমার ছবি দেখালো। তখন বুঝতে পারলাম, আমার তোমার সাথে এতোটা দূরত্ব সৃষ্টি করা ঠিক হয়নি।

– আমি চলে যাবো।

– সেটা হচ্ছেনা। আমি তোমাকে ভালবাসি খুব ভালবাসি। আর আমাদের সন্তানকেও ভালবাসি।

– যদি তোমার সন্তান না হয়?

– শারলিন, তোমার চরিত্র কেমন আমি জানি। আমি ছাড়া তোমাকে কেউই স্পর্শ করেনি। আর তুমি আমার স্পর্শ ছাড়া কারোরই স্পর্শ সহ্য করতে পারো না। আমার বিশ্বাস। তুমি রাগের বসে মিথ্যা বলছো।

আমার খোলা চুল গুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে গলায় চুমু দিয়ে বলল

– তোমার উপর একমাত্র আমার অধিকার। অধিকার ভালবাসা থেকে আসে।

ও আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল

– মিসেস শারলিন, অভিনন্দন আপনাকে এবং আমাকে। আমরা মা বাবা হতে যাচ্ছি।

আমি উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করলাম। কতদিন ও আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরেনি। কতদিন ও আমাকে ভালবাসি কথাটা বলিনি। আজ ২ মাস যাবত আমি শুধু অপেক্ষা করেছি আজকের এই সময়টুকুর জন্য।

ও আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল

– প্লিজ, শারলিন চুপ করো। আর না, অনেক হয়েছে। শান্ত হও, বেশি স্ট্রেস বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর।

কতদিন ওর দেহের ঘ্রাণ আমি পাইনি এতোটা কাছে থেকে। এই ২ টা মাস আমার কাছে অনন্তকালের মতো লেগেছে। আমি ওকে ভালবাসতে চাই, ঘৃণা না।

অধ্যায় 36 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!