পাহাড় এখন সবুজে ভরে গেছে। সবুজ সতেজ পাহাড়ের নিচে সারি সারি গাছের মেলা। তাতে রয়েছে রঙে বেরঙের ফুল। মনে হচ্ছে যেন তারা রং বদলের খেলাতে মেতে উঠেছে। পাখিরাও যেন এতে আনন্দিত হয়ে মধুর সুরে গেয়েই চলেছে।
অন্যদিকে সবুজ পাহাড়ে বুক চিড়ে নেমে আসা ঝর্ণা থেকে অবিরাম পানি পড়ছে আর স্বচ্ছ পানিতে থৈ থৈ শব্দ সৃষ্টি করছে।
ঝর্ণার এই থৈ থৈ শব্দ বাতাসের শা শা শব্দের সাথে মিশে গিয়ে এক নতুন ধ্বনির সৃষ্টি করছে। যা বরাবরই আমার কানে এসে বারি খাচ্ছে।আমিও সেগুলো মন খুলে উপলব্ধি করছি।
বাস চলছে আপন গতিতে। সকলেই কিছু না কিছু করে চলেছে। কেউ আড্ডা দিয়ে চলেছে তহ, কেউ কানে ইয়ারফোন গুজে গান শুনছে, কেউ বা ফোনে তার কথার ভান্ডার শেষ করছে, কেউ বা পারি দিচ্ছে ঘুমের দেশে, আবার কেউ কেউ উপভোগ করছে এই প্রকৃতিটাকে।
আমিও প্রাণ ভরে এই প্রকৃতিটা দেখছি। সেই ছোট থাকতে বাবা,মার সাথে রাঙামাটি এসেছিলাম। আমি কি না খুশিই হয়েছিলাম তা বলার বাহিরে। ছোট থাকতে ঘুরার পাগল ছিলাম আমি তাই বাবা যখনই আর্মি থেকে ছুটি পেয়ে বাসায় আসতো তখনই আমাদেরকে এই প্রকৃতির মাঝে নিয়ে আসতো। তখন কি যে আনন্দ লাগতো আমার।কিন্তু তাদের যাওয়ার পরে যেন এই আনন্দ হারিতে গেল! সাথে হারিয়ে গেল আমার পাগলামিগুলা। সেই থেকে আর কোথাও ঘুরতে যাওয়া হই নি। আজ কত শত বছর পর যে ঘুরতে যাচ্ছি তার হিসাব নেই।
.
এইসব ভেবেই ভিতর থেকে এক দীর্ঘ শ্বাস বেড়িয়ে আসে। সাথে চোখে জল হয়ে বেড়িয়ে আসে কিছু না ভুলা স্মৃতিগুলা। কেউ দেখার আগেই তা মুছে নিলাম। পাশে তাকিয়ে দেখি ড. রিয়ান সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুঝে আছে। কানে ইয়ারফোন।
হুট করেই আমার জানার কৌতূহল জাগে তিনি এত মনোযোগ দিয়ে কি শুনছে!! তাই আমি আর আমার কৌতূহলকে বেশিক্ষন অপেক্ষা না করিয়ে তার কানের থেকে একটা ইয়ারফোন নিয়ে নিজের কানে গুজি। সাথে সাথে কানে ভেসে আসে
.
” Don’t you give up, nah-nah-nah
I won’t give up, nah-nah-nah
Let me love you
Let me love you”
.
আমি সাথে সাথে ইয়ারফোনটা খুলে ছিটকে দূরব স্বরে আসি। তখনই রিয়ান চোখ খুলে আমার দিকে তাকায়। আর ইয়ারফোন খুলে ফেলে। তখন আমি বলে উঠি।
.
— নাউজুবিল্লাহ আস্তাগফিরুল্লা!!!
.
— কি হইসে এমন করতাসো কেন?? ভ্রু কুচকিয়ে।
.
— এই আপনি এইসব লেং বেং কি শুনেন হ্যাঁ!! লজ্জা শরম বলতে কিছুই নাই আপনার?? কিসব বাজে গান শুনতাসেন। নাউজুবিল্লাহ!!
.
রিয়ান রিয়ানার কথা আগা মাথা কিছুই বুজতাসে না। কি বলতাসে ওই এইসব। পরে দেখে একটা ইয়ারফোন ওর দিকেই পড়ে আছে। রিয়ান কিছুটা আনতাজ করতে পেরে বলে।
.
— তুমি কি গানের কথা বলতাসো??
.
— হু। কিসব বাজে গান শুনেন আপনি!! লজ্জা করে না এমন বাজে গান শুনতে?
.
— এইখানে বাজে গান কই পাইলা?? অবাক হয়ে।
.
— কিসব বাজে কথা বলছিল গানে শুনেন নাই?? Let me love you বলতাসিলো। ছি ছি কিসব পঁচা কথা। আমার বলতেও লজ্জা করতাসে। হাত দিয়ে চোখ মুখ ঢেকে রেখে।
.
— তুমি কি বলতাসো তুমি জানোও?? এইটা জাস্টিন বিবারের মোস্ট পপুলার একটা গান। কোটি কোটি মানুষ এই গানটা পছন্দ করে আর তুমি কিনা কিসব বলছো। আড়চোখে তাকিয়ে।
.
আমি মুখের থেকে হাত সরিয়ে বলি।
— হু বুঝেছি।
.
— কি বুঝেছো?? সন্দেহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
.
— এইটাই যে সবাই আপনার মত লুচু বান্দর তাই এমম পঁচা পঁচা কথা বলা গান পছন্দ করেছে।
.
— কি আমি লুচু বান্দর?? অবাক হয়ে।
.
— হু!! লুচু নাম্বার ওয়ান।
.
— Are you out of your mind?? কি যাতা বলছো!! আমি লুচু কিভাবে হলাম??
.
— আপনি এই পঁচা গান এত মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন তাই আপনি লুচু।
.
— তাই নাকি!! তা লুচু উপাধি যখন দিয়েই দিয়েছ তাহলে তার মান রক্ষা করা উচিৎ। তাই না!! তহ কিছু লুচু গিরি দেখিয়েই দেই কি বলো?? আমার দিকে কিছুটা ঝুঁকে বাঁকা হেসে।
.
— ওই আপনি আমার সামনে আসেন কেন?? আমারে জানলা দিয়ে ফালাইয়া দিবেন বুঝি!! প্লিজ ফালাইয়েন না আপনারে আমি চকলেট দিমুনে।
.
আমার এমন বোকা টাইপ কথায় রিয়ান হেসে উঠে। আর আমি আবুলের মত তার হাসির দিকে তাকিয়ে থাকি। আজ প্রথম আমি তাকে হাসতে দেখলাম। তার হাসিটা বেশ লাগছে আমার কাছে। যেন হারিয়ে যাচ্ছি তার হাসিটাতে। তিনি হাসি বন্ধ করে বলে।
.
— ইউ আর জাস্ট ইম্পসিবল!! তোমার সাথে লুচু গিরি সম্ভবই না। তোমার সবকিছুতেই বাচ্চামো। বাচ্চা মেয়ে একটা। মুচকি হেসে।
.
— আপনাকে না হাসলে অনেক সুন্দর লাগে। বলেই মুখে হাত দিয়ে দিলাম। কেমনে জানি মুখ ফসকে বেড়িয়ে গেল।
আমার এই কথা শুনে সে আবারো মুচকি হেসে বলে।
.
— তাই বুঝি!!
.
আমি লজ্জায় শরমে কিছু বলতে পারলাম না। চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে আমার। ইশ কি লজ্জা আর লজ্জা!!
রিয়ানও আমার পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আবার কানে ইয়ারফোন গুজে শুয়ে পড়ে।
.
??
.
প্রায় ঘন্টা খানিক আগেই রাতের খাবার সেরে ফেলা হয়েছে তাই এখন শরীরটা বার বার ঝিমুচ্ছে। তাই আমিও কিছুক্ষণ পরেই পাড়ি দেই ঘুমের রাজ্যে।
রিয়ানের প্রায় চোখটা লেগে গিয়েছিল ঠিক তখনই বাসটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে আর তার বুকের উপর কিছু পড়তে সজাগ হয়ে উঠে সে। চোখ মেলে তাকাতেই দেখে রিয়ানার ঘাবটি মেরে শুয়ে আছে। এতে রিয়ানের মনের ভিতর এক ঝড় বইতে শুরু করলো। সব কেমন অগোছালো লাগতে লাগলো। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে রিয়ানাকে আলতো করে সরিয়ে দিতে নিল যাতে ওর ঘুম না ভাঙে।
কিন্তু রিয়ানা উষ্ণতা পেয়ে রিয়ানকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে। এতে রিয়ানের মনে যেন প্রবল বেগে ঝড় বইতে শুরু করলো।
সে রিয়ানের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। কিছু চুল মুখের উপর এসে পড়েছে। এই আবছা অন্ধকারে চেহারা তেমন বুঝা যাচ্ছে না। কিন্তু রিয়ানের কাছে তাকে বেশ রূপবতী মনে হচ্ছে। রিয়ান আলতো হাতে চুল গুলো সরিয়ে দেয় তারপর নিজের সাথে রিয়ানাকে জরিয়ে নিতে গিয়েও থমকে যায়। কি যেন ভেবে সে হাত সরিয়ে নেয় আর রিয়ানাকে আলতো করে সরিয়ে সিটে ঠিক মত শুয়ে দেয় আর নিজের জেকেটটা ওর গায়ে জরিয়ে দেয়। রিয়ানাও জেকেটটি মুঠো করে আরামসে জরিয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে।
রিয়ান কিছুক্ষণ রিয়ানার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়। তারপর চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করে।