সচ্ছ পানির অন্তরে গভীর হতে গভীরে তলিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। ঠিক সে সময় কোথ থেকে এক জোরা হাত এসে আমায় আগলে ধরলো আর উপর দিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো।
.
অচেতন অবস্থায় মাটিতে শুয়ে আছি আমি। পাশেই আবির আমার দুই গালে আলতো করে থাপ্পড় মারছে আর “রিয়ু রিয়ু” বলে ডেকে চলেছে। অবশেষে আমায় সজাগ করতে না পেরে আমার পেটে চাপ দেয়। দুই তিনবার চাপ দেওয়ার পরই আমার মুখ দিয়ে পানি বেড়িয়ে আসে। আবির আবার আমায় ডাকতে শুরু করে।
.
— রিয়ু! রিয়ু! রিয়ু চোখ খুলো!! এই রিয়ু!! তোমার কিছু হবে না!! এই রিয়ু!! কিছুটা উত্তেজিত সুরে।
.
আমি পিটিপিটি করে চোখ খুলি, সামনে তাকিয়ে দেখি আবির বেশ চিন্তিত সুরেই আমায় ডেকে চলেছে। কিন্তু আমি তার কথার প্রতিত্তোরে কিছু বলতে পারলাম না। চোখ দুটো আবার লেগে আসলো। জ্ঞান হারালাম আবার!!
.
?
.
যখন জ্ঞান ফিরলো তখন নিজেকে ক্যাম্পের বেডে আবিষ্কার করলাম। হাত উঠাতে নিলেই হাতে টান অনুভব করলাম সাথে এক অসহ্যনীয় ব্যথা। আমি সাথে সাথে চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে নিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর আস্তে আস্তে চোখ খুলাম। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখি হাতে ক্যানাল লাগানো আর মাথার উপরেই স্যালাইন ঝুলানো। একবার মনে করার চেষ্টা করলাম আমি এইখানে কিভাবে আসলাম? অতঃপর মনে পড়লো আমি পানিতে ডুবে গিয়েছিলাম আর তখন আবির আমায় বাঁচিয়েছিল। আর আবির এই হয়তো আমায় ক্যাম্পে নিয়ে এসেছিল।
এইবার আমি চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখতে লাগলাম। রাত হয়ে এসেছে। তার মানে সেই দুপুর থেকে আমি অচেতন অবস্থায় পড়ে আছি।
পাশের বেডে চোখ পড়তেই চমকে গেলাম। কেন না সেখান থেকে প্রায় এক হাত দূরেই ড. রিয়ান দাড়িয়ে আছে আর আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখ গুলো হাল্কা লাল, চুল গুলো উষ্কখুষ্ক। মুখটা কেমন মলিন হয়ে আছে। দেখেই বুকটা ধক করে উঠলো। আমি সাথে সাথে নিজের চোখ সরিয়ে ফেললাম আর উঠে বসার চেষ্টা করতে লাগলাম। পরে যেতে নিলেই কেউ আমায় আগলে ধরলো আর আমায় ঠিক করে বসিয়ে দিল।
আমি উপরে তাকিয়ে দেখি রিয়ান। এক পলক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। হয়তো তাকিয়ে থাকলে মায়া বারবে তাই। সে ধমকের সুরে বলে।
.
— তোমাকে উঠতে কে বলেছে স্টুপিড!! শুয়ে থাকা যায় না!! এমনেই শরীর দূর্বল এখন আমি না ধরলে তহ পড়ে যেতে!!
.
আমি আহত চোখে তার দিকে তাকালাম। কেন যেন তার ধমকে আজ নিজের জন্য চিন্তা অনুভব করছি। কিন্তু তারপরও সব কিছু উপেক্ষা করে কঠোর গলায় বলি।
.
— পড়লে পড়তাম। ক্ষতি হলে তো আমার হতো আপনার না!! তাহলে আপনি এত রিয়েক্ট করছেন কেন?? শান্ত ভাবেই।
.
— বেশি কথা বলা শিখে গিয়েছ দেখছি!! তা আমার সাথে এইভাবে কথা বলার সাহস পাও কিভাবে?? দাঁতে দাঁত চেপে।
.
— কিছু কি ভুল বলছি স্যার?? আর আমার মতে আমি বেশ নম্রভাবেই কথাটা বলেছিলাম। এখন তাতে যদি আপনার খারাপ লেগে থাকে তাহলে মাফ করবেন। আমি আপনাকে অসম্মান করে কিছু বলতে চাই নি। বলে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।
.
রিয়ান আমার দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে রইলো। হয়তো বুঝে উঠতে পারছে না কি বলবে?? অথবা কি বলা উচিৎ তার!! আমি কখনো তার সাথে এমন ভাবে কথা বলি না। তাই হয়তো তিনি একটি হতবাক।
আমি আড়চোখে একবার রিয়ানের দিকে তাকালাম সে স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে চোখ পড়তেই আমি চোখ সরিয়ে নেই।
রিয়ান যে এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে তা বেশ বুঝতে পারছি। তাই আমি বলে উঠি।
.
— এইভাবে তাকিয়ে থাকবেন না প্লিজ। আমার অস্বস্তি লাগছে।
.
সে কিছু বলতে নেয় কিন্তু তার আগেই কোথ থেকে আবির এসে হাজির হয় আর আমার কাছে আসে।রিয়ানকে ক্রস করে আমার বেডের পাশে এসে বসে এতে রিয়ান কিছুটা দূরে সরে দাড়ালো। আবির আমার গালে হাত রেখে বলে,
.
— রিয়ু তুমি ঠিক আছো তহ??
.
— হাম। বলে আলতো করে হাতটা সরিয়ে দিলাম।
.
— শরীর খারাপ লাগছে কি?? কখন জ্ঞান ফিরেছে তোমার?? কিছু খেয়েছো কি??
.
— Take a breathe Abir. এক সাথে এত প্রশ্ন এক সাথে করলে কোনটা রেখে কোনটার উত্তর দিব শুনি??
.
— সরি!!
.
— হুহ! আমি ঠিক আছি আর একটু আগেই জ্ঞান ফিরেছে আমার। এখনো কিছু খাই নি। এন্ড বাই দ্যা ওয়ে থেংক্স।
.
— কেন??
.
— For saving my life. নিজের লাইফ রিক্সে রেখে আমায় সেভ করার জন্য।
.
— অহহ কামন রিয়ু!! এইসব ফরমালিটি করবা না তো। ফ্রেন্ডশিপে এইসব চলে না। আর এমনেও আমি তোমাকে নয় নিজেকে বাঁচিয়েছি।
.
— মানে!! অবাক হয়ে।
.
— আব তা কিছু না। কিন্তু তুমি নদীর পারে কি করছিলে আর পড়লেই বা কি করে??
.
— হাঁটতে হাঁটতে ওইদিকে চলে গিয়েছিলাম পরে নদী দেখে পা ভিজিয়ে রাখতে ইচ্ছা করলো তাই নদীর পারে বসে পা ভিজিয়ে রেখেছিলাম। হুট করে মনে হলো কেউ আমায় ধাক্কা দিল যার ফলে আমি পানিতে গিয়ে পড়লাম।
.
— ধাক্কা দিয়েছে মানে?? কে এমন করেছে?? চেহেরা দেখেছো তুমি?? নাম বলো একবার সে কে?? তার এমন অবস্থা করবো না!!
.
— আরেহ আরেহ হাইপার হচ্ছো কেন?? হয়তো কাউরে থেকে ভুল বসতো ধাক্কা লেগে গিয়েছিল!! আর আপনেও পাশে অনেকগুলো পিচ্চি বাচ্চারা খেলা করছিল হয়তো খেলতে খেলতে ধাক্কা লেগে গিয়েছিল। আর এমনেও আমাকেই সাবধান থাকা উচিৎ ছিল।
.
— সাবধানে থাকবে না?? নেক্সট টাইম খেয়াল রেখো।
.
— হুম।
.
আবিরের হঠাৎ রিয়ানের কথা মনে পড়তেই পাশেই তাকায়। রিয়ানকে দেখে সে চোয়াল শক্ত করে ফেলে। একবার আমার দিকে তাকিয়ে রিয়ানের দিকে সরু চোখে তাকায়। তারপর মুখে এক মিথ্যা হাসি টেনে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
.
— ড. সাদাত খান রিয়ান, কেমন আছেন??
.
— আল্লাহের রহমতে অনেক ভালো আপনি। চোখ মুখ শক্ত করে।
.
— হু এতক্ষণ ভালো ছিলাম বাট এখন অনেক ভালো।দাঁতে দাঁত চেপে।
।
তারপর আবির রিয়ানের থেকে নজর সরিয়ে আমার সাথে কথায় মেতে উঠলো। আবির এই সেই বলেই চলেছে আর আমিও হা হু তে উত্তর দিয়েই চলেছি। মাঝে মধ্যে মুচকি হেসে চলেছি।
এইদিকে রিয়ান আবিরের দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে রয়েছে। কেন জানি তার আমাদের দুইজনকে এক সাথে সহ্য হচ্ছে না। সে কিছু না বলে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে বেড়িয়ে আসে।
ক্যাম্প থেকে বের হয়ে সেই টিলাটার পাশে চলে যায় সে। জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে আর নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করার বৃথা চেষ্টা করতে থাকে। পাশে পড়ে থাকা পাথর গুলো উঠিয়ে একের পর এক দূর আকাশের দিকে ছুঁড়ে মারছে আর নিজের রাগ সংযত করছে।
সে কোন মতেই রিয়ানার সাথে আবিরকে সহ্য করতে পারছে না। কেন পারছে না তা তার জানা নেই। দুপুর বেলায়ও রিয়ানাকে আবিরের কোলে দেখে রিয়ান জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। সে রিয়ানাকে কোন মতেই অন্যের বাহুদ্বয়ে সহ্য করতে পারছিল না। ভিতরটা তার জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু যখন রিয়ানের মলিন মুখ দেখতে তখন তার বুকের বা পাশটা মোচড় দিয়ে উঠে। রাগ ভুলে সে দৌড়ে গিয়েছিল রিয়ানার কাছে। ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল রিয়ানার জন্য। সে পারছিল না রিয়ানার এমন মুখটা দেখতে। কেন এমন হচ্ছে তা তার জানা নেই।
.
— কেন এমন হচ্ছে আমার সাথে?? কেন?? এ কোন অনুভূতি আকড়ে ধরেছে আমায়?? রিয়ানার প্রতি এ কেমন আকুলতা আমার?? রিয়ানাকে অন্য ছেলের সাথে দেখলে আমার কেন রাগ হয় কেন?? আবিরের সাথে রিয়ানাকে দেখলে কেন আমার মধ্যে ওকে হারানোর ভয় আকড়ে ধরে?? কেন তখন আবিরকে খুন করতে ইচ্ছে হয় আমার?? কেন!!কেন!! আই ওয়ান্ট এন্সার ডেমিট!! আই ওয়ান্ট এন্সার!!
.
এই বলে রিয়ান হাটুর উপর বসে পড়ে। হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে। সে পারছে না নিজেকে ঠিক রাখতে। তার মনে ভর করেছে হাজারো প্রশ্নের মেলা। যার একটারও উত্তর সে মিলাতে পারছে না।
.
.
???
.
.
দেখতে দেখতে বেশ কয়েকদিন কেটে যায়। আমিও এখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছি। এতদিন শরীরটা হাল্কা দূর্বল ছিল বলে কাজ করতে পারে নি। কিন্তু এখন একদম পার্ফেক্ট তাই আগের ন্যায় কাজে লেগে পড়েছি।
কিন্তু এর মধ্যেও আমি সর্বদা ড. রিয়ানকে এড়িয়ে চলেছি। প্রয়োজনীয় কথ্য ছাড়া আর কোন বাড়তি কথাই তার সাথে বলি নি আমি। রিয়ান এই কয়েকদিনে বেশ কয়েকবার এসেছিল কি জানি কথা বলতে কিন্তু আমি বলে নি। বার বার মনে হচ্ছিল তার সাথে কথা বললে আমি হয়তো নিজের অনুভূতিগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবো না। সেই অনুভূতি গুলো হয়তো আবার আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরবে আমায়। সেই ভয়ে তার থেকে আমি বেশ দূরত্ব বাজিয়ে রেখেছি। এর মধ্যে আবিরের সাথে আমার বেশ ভাব হয়ে যায়। আবির যখন সময় পায় হুট করেই আমার ক্যাম্পে এসে হাজির হয়ে যায়। তারপর সকলের সাথে জমিয়ে আড্ডা দেয়। সকলে তো আবির বলতে পাগল। আমার সাথে যে মেয়েরা আছে তারা তো ওর জাবরা ফ্যান। যখনই আবির আশে তখন তাকে গান গাওয়ার জন্য ঝাঁকড়ে ধরে সবাই। সেও সকলের ইচ্ছা রাখতে গান গায়।
অনেক সময় আমায় নিয়ে নদীর পারে হাটে আর এই সেই কথায় মেতে উঠে। আমিও তার কথার সাথে তাল মিলানোর বৃথা চেষ্টা করি। এইভাবে চলছে দিন।
অন্যদিকে রিয়ান কেন জানি রিয়ানার এমন এড়িয়ে চলাটা মেনে নিতে পারছে না। তার মনটা প্রচন্ড বেকুল হয়ে আছে রিয়ানার সাথে একবার প্রাণ খুলে কথা বলার জন্য। রিয়ানার সাথে আগের ন্যায় ঝগড়া করার জন্য। বার বার মন চায় রিয়ানা তার পাশে থাকুক তার সাথে থাকুক। ওই আবিরের সাথে রিয়ানাকে তার একদম সহ্য হয় না।
হঠাৎ কেন তার এমন অনুভূতি জাগ্রত হলো তা তার জানা নেই। কিন্তু তার যে এই অনুভূতি গুলার নাম জানা নেই। তাহলে কি একেই বলে ভালবাসার অনুভূতি!!
.
.
???
.
অন্যদিকে নিস্তব্ধ এক প্রহরে রাতের অন্ধকারে কেউ একজন পৈচাশিক হাঁসিতে মেতে উঠেছে। স্তব্ধ পরিবেশটিও যেন তার হাসিতে কেঁপে উঠছে। দূর থেকে হিংস্র শেয়ালের হাঁকটিও যেন এই হাসির সাথে তাল মিলাচ্ছে।
হাতে থাকা ড্রিংকসের গ্লাসটি সমান তালে ঘুরিয়েই চলেছে আর হেসে চলেছে। চোখ মুখে এক তৃপ্তির ছোঁয়া।
সে আর কেউ নয় বরং… [বলুম না? কালকে জাইনেন কে এই ব্যক্তি?]