রাত ১০ বেজে ৭ মিনিট। রাস্তায় গাড়ির আনাগোনা কমে এসেছে। তাই হাল্কা নিরবতা ছেয়ে আছে চারদিকে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পরই দূর থেকে কিছু গাড়ি শা শা শব্দে এসে হর্ন বাজিয়ে এই নিরবতা ভঙ্গ করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে থাকা সোডিয়ামের লাইট গুলো এসে পড়ছে আমার উপর। হোলদে আলোতে গায়ের রঙটাও কিছুটা হলদাটে দেখাছে।
আমি স্থির দৃষ্টিতে রিয়ানের ফ্ল্যাটের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আছি আর বার বার তাকে ফোন দিয়েই চলেছি। কিন্তু তার ধরার দাম নেই। ঘড়িতে একবার সময়টা দেখে নিলাম। প্রায় ১৩ মিনিট ধরে তার বাসার সামনে দাড়িয়ে আছি তার সাথে দেখা করবো বলে। পাশেই রিংকি আর আরিশা দাড়িয়ে আছে। আমি এইবার না পেরে অসহায় চোখে তাদের দিকে তাকাই। তারা আমার অসহায় দৃষ্টিটা উপেক্ষা করে কেবলা মার্কা একটা হাসি দেয়। যার মানে, ” অপেক্ষা করা বাদে তাদের এখন কিছু করার নেই। ”
.
এতক্ষণের ভালো লাগাটা যেন এখন বিরক্তিতে পরিনত হলো। রিয়ানকে ফোন করে চলেছি আর নিজেকে বকে চলেছি। কেন যে এই দুই বান্দরনীর কথা শুনতে গেলাম। এখন এই দুটোকে করলার জুস খায়িয়ে উল্টিয়ে পিটাতে ইচ্ছে করতাসে। উফফ!! বিরক্তিকর। ঘোর বিরক্তিকর!!
.
.
?কিছু সময় পূর্বে?
.
.
রিয়ান কথা ভেবে আমি মন খারাপ করে বসে আছি। ঠিক তখনই আরিশা আর রিংকি আমার রুমে আসে। দুইজনে এসেই আমার দিকে তাকিয়ে একটা কেবলা মার্কা হাসি দেয়। দুইজনের এমন হাসি দেখে আমার ভ্রু জোড়া দুটো কুঁচকিয়ে আসে। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে বলি,
.
— কি চাই?
.
— ড. রিয়ানকে মিস করছো তাই না মনু?( আরিশা )
.
— হ্যাঁ তো!
.
— ফোন ধরছে না, কথা হচ্ছে না, মনটা ছটফট করে আছে তাই না! লাইক ” ধাক ধাক কারনে লাগা, ও মোরা জিয়ারা কারনে লাগা। ” একটা কেলানি হাসি দিয়ে। (রিংকি)
.
আমি আমার পাশে থাকা বালিশটা ওর মুখের উপর ছুড়ে মারলাম। তারপর কিছুটা রাগান্বিত গলায় বলি।
.
— কাটা গায়ে নুন দিতে আসছোস! শালী বান্দরনী এইখানে আমি কষ্টে মরি আর তিনি মজা নেয়। তুই বন্ধু নামে কলঙ্ক।
.
— হুহ!! এত বড় অপমান। এসেছিলাম কষ্ট দূর করার ঔষধ দিতে এখন তো ওইটার শিষিও দিব না। (রিংকি)
.
— মানে। সরু চোখে রিংকির দিকে তাকিয়ে।
.
— মানে আমি বলছি। তোকে ড. রিয়ানের সাথে কথা বলার জন্য আমাদের কাছে একটা দারুণ আইডিয়া আছে। (আরিশা)
.
আমি এইবার পিটি চোখে আরিশার দিকে তাকাই।
.
— শুন আমরা এক কাজ করি সোজা ড. রিয়ানের বাসার নিচে হানা বলি। তারপর তাকে ফোন করে নিচে আসতে বলি। যদি না আসতে চায় তাহলে বলবি তুই উপরে চলে আসবি। তখন সে নিচে এসে পারবেও না। তারপর তোর তাকে দেখাও হয়ে গেল প্লাস কথা বলাও। কি জোস না আইডিয়াটা আইডিয়াটা? (আরিশা)
.
— আসল কথা লুকাইয়া গেলি কেন? বল না যে তুইও ড. সিয়ামের সাথে দেখা করতে বের হবি। তখন এই কথা শুনে আইডিয়াটা আমিই দিয়েছিলাম। কেউ ক্রেডিট দেয় না রে। কত স্বার্থপর বান্ধবী। (রিংকি)
.
— আবে চুপ! কথায় কথায় খালি সেন্টি নেস কেন? এখন চুপ থাক। তা রিয়ানু আইডিয়া কেমন লাগলো?
.
আইডিয়াটা আমার কাছে মন্দ লাগেনি বলে আমিও রাজি হয়ে যাই। বিয়ের আগে একদিন পাগলী প্রেমিকা হতে কোন মন্দ নয়। তার উপর এমন কিছু করার অভিজ্ঞতাও আমার নেই। তাই এক রাশ আনন্দ নিয়ে ছুটে পড়ি বনানীর দিকে।
.
.
?
.
প্রায় ১৬ বার ফোন করার পর গিয়ে রিয়ান ফোনটা ধরলো। ধরার সাথে সাথেই রিয়ান ঝাঁজালো কণ্ঠে বলে উঠে।
.
— কি হয়েছে?? এত ফোন দিয়ে জ্বালাচ্ছেন কেন? কাজ নেই কি আপনার? আপনার কাজ না থাকলেও আমার অনেক কাজ আছে। তাই আপনার সাথে কথা বলার সময় আমার নেই। বাই! (রিয়ান)
.
— আরেহ আরেহ শুনেন তো! আমি আপনার বাসার নিচে দাড়িয়ে আছি। প্লিজ একটু নিচে আসুন।
.
রিয়ান এইবার বিষ্ময়কর কন্ঠে বলে উঠে,
— আপনি আমার বাসার নিচে মানে? (রিয়ান)
.
— নিচে মানে নিচে। আপনি একটু দয়া করে নিচে নামবেন নাকি আমি উপরে আসবো?
.
রিয়ান আমার কথা বিশ্বাস না করতে পেরে সে বারান্দায় এসে নিচে উঁকি দেয়। তারপর আমাকে দেখতে পায়। সাথে আরিশা আর রিংকিকেও। রিয়ান এইবার বলে,
.
— তুমি দাড়াও আমি আসছি!
.
কথাটা শুনার সাথে সাথে মনটা খুশিতে নেচে উঠলো। আমি আরিশা আর রিংকির দিকে তাকিয়ে বলি।
.
— আসছে।
.
তারা শুনে এইবার স্বস্তির নিশ্বাস নিল তারপর আমাকে বলে,
.
— বইন এইবার আমি যাই। আমরাটা অনেকক্ষণ ধরে ওয়েট করছে। আমি একবারে বাসার নিচে চলে আসবো নে। বাই! (আরিশা)
.
এই বলে আরিশা দেয় দৌড়। রিংকি এইবার আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
.
— বইন আমি আবার কাবাব ম্যায় হাড্ডি হতে চাই না। আমি পাশের ওই পার্কেই আছি। তোদের প্রেময়ালাপ শেষ হলে ফোন দিস কেমন!
.
এই বলে রিংকিও উল্টো পথে হাটা ধরে। আমি এইবার রিয়ানের জন্য পথ চেয়ে দাড়িয়ে থাকি।২ মিনিটের মধ্যেই রিয়ান এসে হাজির। চোখ মুখে রাগের আভা স্পষ্ট ফুটে রয়েছে। রিয়ান কিছুটা রেগে বলে,
.
— এত রাতে কোন আক্কেলে এইখানে এসেছেন? মাথার সব তার ছিড়ে গিয়েছে নাকি!
.
— আপনি যদি নিখোঁজ হয়ে থাকেন তাহলে আমি এই বা কি করবো?
.
— এমন পাগলামোর মানে কি?
.
— ভালবাসা মানেই পাগলামি! আর যেখানে ভালবাসার মানুষটি অভিমান করে বসে আছে তাকে মানাতে তো একটু খানি পাগলামি না করলে চলেই না।
.
— ইউ আর জাস্ট ইম্পসিবল! এখন যদি আপনার পাগলামো করা শেষ হয়ে থাকে তাহলে নিজ বাসায় যান।
.
— তার আগে বলুন আমার সাথে কেন যোগাযোগ করছেন না? কেন দূরে সরিয়ে রেখেছেন?
.
— তার উত্তর আপনি ভালো করেই জানেন। আর এখন বাসায় যান অনেক রাত হয়েছে।
.
এই বলে রিয়ান উল্টো ঘুরে হাটা শুরু করলেই আমি তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরি আর কেঁদে দেই।
.
.
?
.
— আসলেই মেয়েরা লেট লতিফ। তার জীবন্ত প্রমাণ তুমি! (সিয়াম)
.
— এই একদম বাজে বকবেন না। আমি কি স্বাদে দেরি করেছি নাকি? কিছু কাজ ছিল বলে দেরি হয়েছে। (আরিশা)
.
— আমার সাথেই দেখা করার সময় তোমার কাছে এত কাজ কোথ থেকে আসে? (সিয়াম)
.
— আসমান থেকে টপকে টপকে পড়ে। হুহ! (আরিশা)
.
— থাক আর মুড অফ করতে হবে না। লুক হোয়াট আই হ্যাভ ফোর ইউ। (সিয়াম)
.
এই বলেই সিয়াম এক বক্স চকলেট আরিশার সামনে ধরে। আরিশা তা দেখেই খুশিতে লাফ দিয়ে উঠে। সিয়াম তা দেখে আনমনেই হেসে উঠে। আর বলে,
— পাগলিটা!
.
.
?
.
রিংকি পার্কে হাটছে আর নিজের সাথেই বকবক করেই চলেছে।
.
— হুহ! সবাই মিঙ্গেল আমি একাই সিঙ্গেল। এই অন্যায় কেন করলা তুমি আল্লাহ। আমারও মিঙ্গেল বানাইয়া দাও না। আমি কেন একা একা চিরকুমারী থাকুম। আমার মত কিউট ইনোসেন্ট মাসুম মেয়ের উপর একটু রেহেম করো।
.
এইসব বলতে বলতে হাটছিল তখন রিংকি কাউরো সাথে ধাক্কা খায় আর নিচে পড়ে যায়। নিচে পড়েই রিংকির কথার বুলি ফুটি উঠে।
.
— আবে কোন কানা রে! দেখে হাটতে পারেন না? আহহ! আমার কোমর।
.
— আরেহ মিস বকবক! প্লিজ স্টোপ ইউর বকবক!
.
— কে রে! বলেই রিংকি মাথা তুলে তাকাতেই দেখে ব্রিটিশ বান্দর। রিংকি বলে উঠে।
.
— আরেহ ব্রিটিশ বান্দর আপনি! তাহলে আপনি সেই কানা! (রিংকি)
.
— হোয়াট ডু ইউ মিন বাই কানা?
.
— কানা মিন্স অন্ধ। যা আপনি। ব্লাইন্ড ম্যান! (রিংকি)
.
— ইউউ!!
.
— অহহ সাথে মেনারলেস ও।(রিংকি)
.
— কিভাবে??
.
— এতক্ষণ ধরে একটা মেয়ে নিচে পড়ে আছে যাকে নাকি আপনি ধাক্কা দিয়েছেন তাকে তুলছেনও না পর্যন্ত। সে কি ঠিক আছে কিনা তা তো পরের ব্যপার।(রিংকি)
.
— অহহ মাই গুড নেস! যে মেয়ে নাকি এতক্ষন ধরে বসেই আমার সাথে ঝগড়া করা শুরু করে দিয়েছে সে নাকি আবার ঠিক নেই। হাও ফানি!
.
রিংকি এইবার চট করে দাড়িয়ে গিয়ে তেরে এসে বলে।
— এই ব্রিটিশ বান্দর! একদম বাজে বকবেন না। আমি কখন ঝগড়া করলাম হ্যাঁ! (রিংকি)
.
— একেই বলে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করা। বাই দ্যা ওয়ে আপনার সকল ব্যথা দেখি ৫ মিনিটেই হাওয়া হয়ে গেল। Strange!
.
— তাতে কি হ্যাঁ? আমার ব্যথা আমার সব। যখন ইচ্ছা আসতেই পারে আর চলে যেতেও পারে। তা আপনার মত ব্রিটিশ বান্দর বুঝবে না। হুহ! (রিংকি)
.
— আই হ্যাভ আ ন্যাম ওকে! ডোন্ট কল মি ব্রিটিশ বিনদর ওর হোয়াট এভার ইট ইজ!
.
— অহহ তাই নাকি? তা শুনি তো একটু আপনার নামটা কি ব্রিটিশ বান্দর জি!(রিংকি)
.
— ইশান আশরাফ!
.
— হাহ! এই নামের চেয়ে ব্রিটিশ বান্দর বেশি সুট করে আপনাকে। (রিংকি)
.
— ইউউউউ!!
.
ব্যাস লেগে গেল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ।