খাওয়া দাওয়া শেষে আমি যখন ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে বের হতে যাব তখনই আমার চোখে কেউ কালো কাপড় বেধে দেয়। আর আমার মুখে হাত দিয়ে টেনে কোথাও নিয়ে যেতে থাকে। আমি হাত পা ছুড়াছুড়ি করতে থাকি। কিন্তু তার সাথে পেরে উঠতে পারছিলাম না। কি করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না! তখনই সে আমায় ছেড়ে দেয়। আমি ছাড়া পেয়ে দ্রুত নিজের চোখ থেকে কাপড়টা খুলে ফেলি।
এতক্ষণ চোখটা বেঁধে থাকার কারণে সব কিছু আবছা দেখতে শুরু করি।
আমি আবছা চোখেই চারকদিকটা বুঝার চেষ্টা করি। ধীরে ধীরে সব কিছুই আমার কাছে পরিষ্কার হতে শুরু করে। আমি একটা বাগানের মধ্যে আছি। সম্ভবত এইটা সেন্টারের পিছনের দিকটা। আমি আশে পাশে খুঁজতে থাকি কে আমায় এইখানে এনেছে।
তখন হুট করেই কেউ আমায় পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আর আমার কানের সামনে মুখ এনে লো ভয়েসে বলতে থাকে।
.
— ?তোমাকে ভালবাসবো বলে,
নিজেকে গড়ি শত বার।
তোমাকে পাবো বলে,
নিজেকে আসক্ত করে রাখি শতবার।?(রিয়ান)
.
রিয়ানের কণ্ঠ কানে আসতেই আমি স্বস্তির নিশ্বাস নেই। তারপর নিজেকে সামলিয়ে বলি।
.
— উফফ রিয়ান আপনি!!
.
— হু আমি! কেন অন্য কাউকে আশা করেছিলে বুঝি? (রিয়ান)
.
— ননা ততেমন কিছু না। এইভাবে চোখ মুখ বেঁধে কেউ নিয়ে এসেছে বলে আমি একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কে না কে!
.
— রিয়ান থাকতে কেউ তার রিয়ুপাখির দিকে চোখ তুলেও তাকাতে পারবে না। ছুঁয়া তো দূরের কথা। (রিয়ান)
.
— আচ্ছা রিয়ান আপনি কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করেন?
.
— বিশ্বাসঘাতকতা আর সত্য লুকানো। আমি সব কিছুর জন্য সহ্য করতে পারি কিন্তু আমার সাথে যদি কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে বা আমার থেকে সত্যটা লুকায় যেটা আমার জানার দরকার তাহলে আমি আর সহ্য করতে পারি না। আর না তাকে ক্ষমা করতে পারি। (রিয়ান)
.
— আমাকে তো অনেক বেশি ভালবাসেন তাই না?
.
— কোন সন্দেহ আছে তাতে? নিজের থেকেও বেশি ভালবাসি। তুমি ছাড়া আমি যে নিঃসঙ্গ। (রিয়ান)
.
— মনে করেন, যদি কখনো জানেন যে আমার কোন এক অনেক বড় সত্য আপনার থেকে গোপন করে রেখেছি, যেটা জানার পর হয়তো আমাদের অবস্থান পরিবর্তন হতে পারে তখনও কি এমন করেই ভালবাসবেন?
.
— কেন নয়। তোমাকে আমি এখন যতটা ভালবাসি ঠিক পরবর্তীতেও এমন করেই ভালবাসবো। আর এমনেও আমি জানি আমার রিয়ুপাখি আমার থেকে কখনো কিছু লুকাবে না। আই ট্রাস্ট হার আ লোট। (রিয়ান)
.
আমি প্রতিউত্তরে কিছু বললাম না। শুধু নিরবে এক দীর্ঘ শ্বাস নিলাম। রিয়ান তা দেখে বলে।
.
— বাদ দাও তো এইসব। আজকে আমাদের লাইফের অনেক স্পেশাল একটা ডে। তাই আমি একে আরও স্পেশাল করতে চাই। (রিয়ান)
.
আমি এইবার কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকাই। সে মুচকি হেসে আমাকে ছেড়ে দিয়ে আমার হাত ধরে সামনের দিকে নিয়ে যায়। তারপর আমায় বলে।
.
— সামনে একবার তাকাও। (রিয়ান)
.
আমি সামনে তাকাতেই চমকে যাই। তারপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারদিক পর্যবেক্ষণ করতে থাকি। সামনে একটা টেবিল রাখা। তার চারপাশেটা লাইটিং করা। টেবিলের উপরে একটা মিনি ডার্ক চকলেট কেক রাখা আর তার চারপাশে লাল গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো। কেকটির উপর লিখা ( ❤ Mr And Mrs ❤)।
আমি এইবার মুদ্ধ চোখে রিয়ানের দিকে তাকাই। রিয়ান এইবার আমায় পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আমার হাতে ছুড়ি ধরায়। তারপর বলে,
.
— Let’s cut the cake. (রিয়ান)
.
অতঃপর আমিও সমতি জানাই। দুইজনেই এক সাথে কেক কাটি। রিয়ান একটা পিস নিয়ে আমাকে খায়িয়ে দেয়। আমিও তাকে খায়িয়ে দেই। রিয়ান আমার হাতে একটা পিস ধরিয়ে দিয়ে বলে।
.
— নাও খাও। আমি জানি তোমার ডার্ক চকলেট কেক ফেভরিট। (রিয়ান)
.
আমি এইবার কেকটা হাতে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। তারপর হাল্কা কামড় দিয়ে খেতে থাকি আর ভাবতে থাকি।
.
— রিয়ান আমায় এত ভালবাসে এত টাস্ট করে। তার ট্রাস্ট ভাঙাটা কি ঠিক হবে? নিজের অতীত লুকাতে গিয়ে তাকে ঠকাচ্ছি না তো! আমাকে তাকে আরিয়ানের ব্যপারে সব বলে দেওয়া উচিৎ। পরে যা হবে দেখা যাবে। ( মনে মনে)
.
আমি কিছুটা সাহস জুগিয়ে বলে উঠি।
— রিয়ান আমায় না আপনাকে কিছু বলার আছে।
.
— হুম বলো। আমার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে। (রিয়ান)
.
— আসলে রিয়ান না মানে আমি! আর বলতে পারলাম না।
.
— হুসস! (রিয়ান)
এই বলে রিয়ান আমার গালে হাত রেখে বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে আমার ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা চকলেটটা মুছে দিয়ে ঠোঁটের কোনে টুপ করে কিস করে বসে। আমি এইবার অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। রিয়ান মুচকি হেসে বলে।
.
— অনেকক্ষন ধরে এইটা আমায় টানছিল। শেষে আর নিজেকে সামলিয়ে রাখতে পারলাম। মুচকি হেসে। তারপর বলে।
— এখন বলো কি বলছিলে? (রিয়ান)
.
আমি এইবার এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করি।
— আমি আগে থেকেই…
.
আর বলতে পারলাম না। তখনই রিয়ানের ফোন বেজে উঠলো। রিয়ান ফোন বের করে দেখে আরিয়ান ফোন করেছে। রিয়ান ফোন ধরতেই আরিয়ান বলে উঠে।
.
— ব্রো তুই কই? দীদা চেয়ার থেকে পড়ে গিয়েছে। কোমরে নাকি অনেক ব্যথা পেয়েছে। তুই একটু তারাতাড়ি আয়।
.
— কি বলছিস এইসব! ওয়েট আমি এখনই আসছি।
এই বলে ফোন রেখে দেয়। আমি তার দিকে তাকিয়ে বলি। (রিয়ান)
.
— কি হয়েছে?
.
— দীদা চেয়ার থেকে নাকি পড়ে গিয়েছে। তারাতারি যেতে হবে। চল! (রিয়ান)
.
এই বলে রিয়ান ভিতরের দিকে দৌড়ে যায়। আর আমি তার যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। তখনই কাউরো হাত তালির আওয়াজ কানে আসতেই আমি সেদিকে তাকাই। দেখি আরিয়ান। আরিয়ানকে দেখার সাথে সাথে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। চোখ মুখে ভয়ের রেখা ফুটে উঠে। কিন্তু তাও নিজেকে শক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাই। আরিয়ান আমার সামনে এসে বলে।
.
— আহ! কি ভালবাসা! দেখে না হিংসে হচ্ছে। তোমাদের মধ্যে যে এত ভালবাসা আগে জানতাম না। কিন্তু যখন সে সত্যি জানবে তখন কি এই ভালবাসাটা থাকবে? (আরিয়ান)
.
— আমারটা জানি না কিন্তু তোমার যে অবস্থা খারাপ হবে তা জানি। দোষী তুমি হবে আমি না।
.
— Ops! I am scared. হাহা!! ঠিকই বলেছো, সত্যিটা সবাই জানবেই ঠিকই কিন্তু আমার বলা সত্যিটা সবাই জানবে৷ যেখানে দোষী তুমি! চরিত্রহীনা তুমি!সবাই জানবে কিন্তু তা এখন না, সঠিক সময় হলে। (আরিয়ান)
.
— আমি এর আগেই রিয়ানকে সব বলে দিব।
.
— আ’ম ইম্প্রেসড বেব!! আমার সাথে টকর দিতে চাচ্ছো। গুড! বাট আফসোস! তুমি রিয়ান ভাইকে কিছুই বলতে পারবে না। কেন না আমি বলতে দিব না। যেমনটা এখন দেই নি। (আরিয়ান)
.
— তার মানে এইসব তোমার কারসাজি।
.
— ইয়েস বেব!! তুমি দেখি আগের থেকে অনেক বুদ্ধিমতি হয়ে দিয়েছ। এই বলে আমার চুলে হাত দিতে নিলে আমি ছিটকে দূরে সরে যাই। (আরিয়ান)
.
— Don’t you dare! Stay away from me. রিয়ান যদি একবারও জানতে পারে না তোমার সম্পর্কে তাহলে দেখ তোমায় তিনি কি করে!
.
— বাহ! এত ট্রাস্ট, এত ভালবাসা। বাট একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে এখন তোমাদের আলাদা করতে আরও বেশি মজা পাবো আমি। ভালবাসা যত বেশি কষ্টও ততো বেশি। Uff! It is going to be interesting. এই বলে পৈচাশিক হাসিতে মেতে উঠে। (আরিয়ান)
.
তার এই হাসিটা আমার শরীরে কাটার মত বিধছিল। আমি কোন মতে নিজেকে সামলিয়ে বলি।
.
— তুমি কিছু করতে পারবে না। আমাদের আলাদা করতে পারবে না তুমি। দেখে নিও।
.
এই বলে আর এক মিনিটও সেখানে দাড়িয়ে না থেকে দ্রুত পা চালিয়ে সেখান থেকে চলে আসি।
ভিতরে ঢুকতেই হাত পা কাঁপা কাঁপি শুরু হয়ে যায় আমার। যতই বাইরে দিয়ে নিজেজে শক্ত দেখাই না কেন ভিতরে আমি ভয়ে জমে যাচ্ছি।
আমি এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে সামনে যেয়ে দেখি সবাই গোল হয়ে আছে। দীদাকে রিয়ান কোলে নিয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আমি গিয়ে রিংকি আর আরিশার পাশে দাড়াই। তারা দুইজন আমায় দেখে চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করে সব ঠিক আছে কিনা! আমি হ্যাঁ সূচক উত্তর দেই।
অতঃপর রিয়ান আমার দিকে তাকিয়ে বলে যেন আমরাও তাদের সাথে এখনই বেড়িয়ে পড়ি। রিয়ানের কথা অনুসারে আমরা সকলেই একসাথে বেড়িয়ে পড়ি।
.
.
??
.
— এই আরিয়ানের বাচ্চাকে তো আমি জানে মেরে ফেলবো। ওর সাহস তো কম তোকে থ্রেড দেয়। ( আরিশা)
.
— তার উপর ওকে ড. রিয়ানের ফুপাতো ভাই হতে হলো! দুনিয়াতে কি ভাইয়ের অভাব পড়েছিল নি যে ড. রিয়ানকেই ওর ভাই হতে হলো। ( রিংকি)
.
বাসায় এসে ফ্রেশ হওয়ার পর আমি ওদেরকে শুরু থেকে সব বলি। আর সব শুনার পরে তাদের রিয়াকশনই এইটা।
.
— তুই যত তারাতারি সম্ভব ড. রিয়ানকে সব কিছু বলে দে। তা না হলে পরে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে। তখন চাইলেও তুই সামাল দিতে পারবি না। (আরিশা)
.
— আমি জানি। আজ আরিয়ান মাঝে ওই কারসাজি না করলে আমি তাকে সব বলে দিতাম। আমাকে এখন যেভাবেই হোক তাকে সব জানাতে হবেই।
.
— এইটাই ভালো হবে। (আরিশা)
.
— রিয়ানু তুই ঠিক আছিস তো? (রিংকি)
.
— হুম। অনেক কষ্টে নিজেকে ঠিক রেখেছি। যদি তোরা আগে থেকে আমায় শক্ত না করতি তাহলে হয়তো আমি এখন পুরোপুরি ভাবে ভেঙে পড়তাম।
এই বলে ওদের দুইজনকে জড়িয়ে ধরি। এখন শুধু কালকের অপেক্ষা। কালকে আমি সব সত্যি বলে দিব তাকে।
.
.
??
.
সারা রাতটিই নির্ঘুমে কাটিয়ে দেই আমি। ভোরে ফজরের নামাজ সেরে যখন একটু শুই তখন ঘুম এসে ভোর করে আমার দুই নয়নে।
সকালে ফোনের রিংটনের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়। আমি ঘুম ঘুম চোখে ফোন কানে নিয়ে যা শুনি তাতে আমার ঘুম উড়ে চলে যায়। চোখ দিয়ে অনাবরতো পানি পড়তে থাকে। আমি লাফ দিয়ে উঠে বসে পড়ি। আমার কাঁন্নার আওয়াজে রিংকি আর আরিশাও ঘুম থেকে জেগে উঠে। তারা আমাকে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকে ” কি হয়েছে? কান্না করছি কেন?” আমি কাঁন্নার জন্য কিছু বলতে পারছিলাম না। অতঃপর কোন মতে অস্পষ্ট সুরে বলে উঠি।
.
— রররিয়ান এএএকক্সিডেন্ট কককরেছে!