আমি এইবার দ্রুত হাতে রেপিং পেপারটা খুলতে শুরু করি। এরপর আমি যা দেখি তাতে আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠি,
.
— আয়ায়ায়ায়া!!!
.
আমার চিৎকার শুনে নিলা, মাইশা আর রিনা চমকে উঠে। আর উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকে, “কি হয়েছে? কি হয়েছে?”
আমি কিছু না বলেই আমার হাতে থাকা জিনিসটা দূরে ছুড়ে মারি। মাইশা তা দেখে কৌতূহলের বসে সে নিচে নেমে সেই জিনিসটা হাতে নেয়। তারপর মাইশাও ভয়ে পেয়ে চিৎকার করে উঠে।
আমার চিৎকার শুনে ইতি মধ্যে দীদা, ছোট ফুপু, বড় আর ছোট খালা রুমে এসে পড়ে।দরজায় থাকতেই মাইশার চিৎকার শুনে তারা আরও ভয় পেয়ে যায়। তারা দ্রুত রুমে এসেই জিজ্ঞেস করতে থাকে, ” কি হয়েছে? চিৎকার কেন করলি তোরা?”
দীদা আমার কাছে এসে আমার চিৎকার করার কারণ জানতে চাইলো কিন্তু আমার গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না। ভয়ে আমার হাত পা থরথর করে কাঁপছিল।
দীদা এইবার নিলা আর রিনাকে জিজ্ঞেস করে কিন্তু ওরা কিছু না জানায় কিছু বলতে পারছিল না। তাই সকলেই এইবার মাইশার কাছে যায়। আর মাইশাকে জিজ্ঞেস করতে থাকে। মাইশা তখন কাঁপা কাঁপা হাতে মাটিতে পড়ে থাকা জিনিসটির দিকে ইশারা করে। সবাই এইবার সেইদিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠে।
মেঝেতে একটি পুতুল পড়ে আছে। পুতুলটিকে বধুর মত সাজানো হয়েছে। ঠিক একদম রিয়ানার বধু সাজের মত। সেই পুতুলটির শরীর রক্তে রঞ্জিত। একটা চোখ উবরে ফেলা হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গা কাঁচের মত টুকরা বসানো। কতটা না বীভৎস লাগছে এইটিকে দেখতে। যে কেউ দেখলে ভয়ে কাঁপতে থাকবে। তার উপর যখন এইটি নির্দিষ্ট কাউকে নির্দেশ করে আর সে বুঝতে পারে তখন তার ভয়টা ঠিক কত গুন বেরে যায় তা সকলের ভাবনার বাইরে।
দীদা এইবার দ্রুত সার্ভেন্টদের ডাক দিয়ে সেটি সরিয়ে ফেলে তারপর রিয়ানার কাছে গিয়ে বসে আর ওকে মাথা হাত রেখে বলে,
.
— তুই এত ভয় পাচ্ছিস কেন বল? এইটা হয়তো কেউ মজা করে এমনটা করেছে। তুই ভয় পাইস না কেমন! এই রাহেলা যা তো দুই গ্লাস কুসুম গরম পানির মধ্যে লবণ মিশিয়ে আনতো। বাচ্চা দুটো বেশ ভয় পেয়েছে।
.
রাহেলা ফুপু দ্রুত রান্নাঘরে দুইগ্লাস লবণ ভেজা পানি নিয়ে আসে। এক গ্লাস আমাকে ধরিয়ে তিনি মাইশার কাছে যান। মাইশাকে তার মা মানে ছোট খালা আগলে রেখেছেন। মাইশাকে গ্লাসটা দিয়ে সেও মাইশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। তখন রাহেলা ফুপু দীদাকে বলে,
.
— ভাগিস মা মেহমানরা ৫ মিনিট আগেই চলে গিয়েছিল তা না হলে এইসব দেখলে কি কানা ঘুষাই না শুরু করতো।
.
তখন দীদা এইবার রেগে গিয়ে বলে,
— তুই চুপ করতো! নিজের তো আক্কেল জ্ঞান নাই তার উপর আসছে বাইরের মানুষদের কি বলতো তা ভাবতে।
.
— মা আমি তো..
.
— চুপ থাকতে বলেছি না তোকে! তুই যা তো রুম থেকে। আর নাসরিন (ছোট খালা) শুনো তুমি মাইশাকে নিয়ে রুমে যাও। ওকে ঘুম পারিয়ে দাও। ঘুমালে সবকিছু ভুলে যাবে।
.
— আচ্ছা খালাম্মা।
এই বলে তিনি মাইশাকে নিয়ে যায়। বড় খালা অনেক আগেই নিলা আর রিনাকে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। সে চাই নি তারা দুইজন এমন এক পরিবেশে থাকুক। ছোট ফুপুও আস্তে করে বেরিয়ে যায়। দীদা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
.
— এখনো ভয় করছে?
.
আমি কিছু বলতে না পেরে শুধু মাথা দুলিয়ে ” হ্যাঁ” সূচক উত্তর দেই। তা দেখে তিনি বলে,
.
— আচ্ছা আগে পানিটা খা। ভালো লাগবে।
.
আমি চুপচাপ তার কথা শুনে পানিটা খেয়ে নেই। দীদা তা দেখে মুচকি হেসে বলে,
.
— এই তো আমার সোনা বাচ্চাটা। তা এখন একটু ঘুম দে, আমি তোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। আর এখন ভুলেও ওইসবের কথা ভাববি না। দুঃস্বপ্ন মনে করে ভুলে যা। কেউ হয়তো বা মজার করার উদ্দেশ্যেই এমনটা করেছে। তাই এইটা নিয়ে এত ভেবে লাভ নেই। যত এইটা নিয়ে ভাববি ততো শুধু দুঃশ্চিন্তা বাড়বে বুঝলি!
.
আমি এইবারও শুধু মাথা দুলাই আর শুয়ে পড়ি। দীদা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে আর গল্প করতে থাকে। তার গল্পগুলো বেশ ভালোই লাগছিল। মনের ভিতর থেকে আস্তে আস্তে ভয়ের রেশটা কেটে যাচ্ছিল। একসময় তার গল্পগুলো শুনতে শুনতেই ঘুমের দেশে তলিয়ে যাই।
.
.
?
.
বিকেলে সকলের সাথে মিলে আড্ডা দিচ্ছি। ছোট বড় সবাই আছে এইখানে। হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠেছে সবাই। একেকজন সকলের ছোট বেলার মজার ঘটনাগুলো বলে যাচ্ছে। যার কথাটা বলা হচ্ছে সে তো লজ্জায় শেষ আর বাকিগুলো ইচ্ছে মত তার মজা নিচ্ছে। বলতে গেলে এক প্রকার ঘরোয়া রেগিং চলছে।
এদের সাথে গল্প করতে করতে সকালের কথাটা যেন প্রায় ভুলেই গিয়েছি। দীদা সকলকে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন যেন কেউ সকালের কথা আর না উঠায়। এইভাবেই আমি আর মাইশা ভয় পেয়ে আছি। তাই আমাদের মন থেকে সে ভয় দূর করতে এদের যত প্রচেষ্টা। আমাদের দুইজনকে ভুলিয়ে হাসি খুশি রাখাটাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। আসলেই এমন ফ্যামিলি পাওয়াটা খুবই কঠিন। কেউ ঘরের নতুন বউয়ের জন্য ঠিক এতটা করে না।
এদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে সন্ধ্যা নেমে আসে। হাসি মজার মধ্যে কত দ্রুত যে সময় পার হয়ে গেল তা বুঝাই যাই নি। মাগরিবের আযান কানে আসতেই সকলে যার যার রুমে চলে যাই। আমিও রুমে এসে নামাজটা পড়ে ফেলি। এর কিছুক্ষণ বাদেই রিয়ান চলে আসে। রিয়ান ক্লান্ত হয়ে এসে বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ে। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। আমি রিয়ানের জন্য ঠান্ডা পানি নিয়ে আসি। রিয়ান এইবার উঠে সেই পানিটুকু খেয়ে নেয়। আমি তার দিকে তাকিয়ে বলি,
.
— যান ফ্রেশ হয়ে আসেন। ওয়াশরুমে আপনার তোয়েলা, গেঞ্জি আর টাউজার রেখে এসেছি।
.
— বাহ একদিনেই দেখি একদম পার্ফেক্ট গিন্নি হয়ে গিয়েছ। বেশ ভালোই লাগছে এখন আসলেই মনে হচ্ছে যে আমি বিয়ে করেছি। মুচকি হেসে।
.
— হ্যাঁ তা তো করেছেন এই। একবার নয় দুই দুই বার। বুঝলেন!
.
— তাতে কি করেছি তো একজনকেই। কিন্তু প্রথম বিয়েতে তো আর সংসার করিনি। সংসার করছি তো মাত্র ২০ ঘন্টা ৩৭ মিনিট ৫৩ সেকেন্ড ৪৯ নেনোসেকেন্ড ধরে। মুখে প্রশান্তির হাসি ঝুলিয়ে।
.
রিয়ানের কথায় আমার চোখগুলো মার্বেলের মত বড় হয়ে যায়। আমি এইবার বলি,
— আল্লাহ! আপনি এত হিসাব করে রেখেছেন? মানে নেনোসেকেন্ডেরও! কিভাবে? বিষ্ময়কর চোখে।
.
রিয়ান এইবার আমার কাছে এসে আমার নাক ধরে টেনে বলে,
— যাকে কেউ নিজের থেকে বেশি ভালবাসে তার কাছে সেই মানুষটির সাথে কাটানো প্রত্যেকটা মিনিটের হিসাব থাকে। আর সেখানে তো তুমি আমার ভালবাসা না আমার আসক্তি। সেই হিসাবে তো নেনোসেকেন্ড কি এর কমের হিসাবও যদি রাখতে পারতাম তাও রাখতাম।
.
— আপনি যে একটা পাগল তা কি জানেন?
.
— হ্যাঁ জানি। কিন্তু এই পাগলটা শুধু একজনের জন্যই পাগল আর তার নাম হলো রিয়ুপাখি। আমার পাগলামি তোমাতেই শুরু আর তোমাতেই শেষ। আর এই পাগলামি যে ঠিক কোন পর্যায় পর্যন্ত যেতে সেটার তোমার কোন ধারণাই নাই। নেশাগ্রস্ত কণ্ঠে।
.
— পাগল একটা। এখন যান ফ্রেশ হয়ে আসুন।
.
— হুহ!
.
.
?
.
রাতে খাওয়া শেষে যে যার রুমে শুয়ে পড়েছি। কালকে যেহেতু বৌ-ভাত তাই সকালে অনেক কাজ আছে। যার জন্য সকলেই আগে ভাগে শুয়ে পড়েছে। আমিও রুমে এসে ঘুমোবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। শাড়িটা বদলিয়ে কামিজ পড়ে নিয়েছি। এখন আয়নার সামনে দাড়িয়ে চুলগুলো আঁচড়িয়ে বেনুনী করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। রিয়ান তখন পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরে আমার কাধে থুতনি রেখে বলে,
.
— কালকের জন্য তোমার সকল কিছু কিন্তু রেডি। কাবার্ডের রাইট সাইটে কিন্তু আমি সব রেখে দিয়েছি। তুমি সবকিছু দেখে বুঝে নিও। আর কালকে সকাল সকালই মেকাপ আর্টিস্টরা এসে পড়বে কিন্তু। তাই এর আগেই নাস্তা করে নিও। আর..
.
আমি রিয়ানকে আর বলতে না দিয়ে বলি,
— ব্যাস রিয়ান! আমি একসাথে কত কিছু কিভাবে মনে রাখবো? অবাক হয়ে।
.
— রাখতে হবে। সকাল থেকে ব্যস্ত থাকবো আমি। তোমার ব্যপারটা ভালো মত দেখতে পারবো না। তাই আগে থেকেই তোমাকে বলে দিচ্ছি। গাল টেনে।
.
— আমাকে নিয়ে আপনার এত চিন্তা? আমি তো আস্তে আস্তে আপনার উপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছি রিয়ান। এখন তো ভয় হচ্ছে, যদি কোন সময় আপনার থেকে দূরে চলে যাই আর তখন আমি….
আর কিছু বলতে পারলাম না। রিয়ান আমার মুখ চেপে ধরে বলে,
.
— আমায় ছেড়ে তুমি কোথাও যেতে পারবে না। এমকি তুমি আমায় ছাড়তে চাইলেও আমি তোমায় আমাকে ছাড়তে দিব না। আগেই বলেছি তুমি আমার ভালবাসা না আমার আসক্তি। ভালবাসাও একসময় ছাড়া যায় কিন্তু আসক্তি কখনো ছাড়া যায় না। তাই তুমি কখনোই আমি ছাড়া হবে না। গম্ভীর কন্ঠে।
অতঃপর সে হাতটা সরিয়ে নেয়।
.
— বুঝেছি। আমিও প্রমিস করছি আমি আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। সবসময় আপনার আসক্তি হয়ে পাশে থাকব। মুচকি হেসে।
.
— হুম! এই বলে রিয়ান অভিমান করে সরে যেতে নিলে আমি খপ করে তার বা হাতটা ধরে ফেলি আর জরে টান দেই। সাথে সাথে রিয়ান চমকে উঠে।
আমি হাতে টান দিতেই রিয়ানের হাতের চামড়াটা কিছুটা কুচকিয়ে আসে। তা দেখে আমি বিষ্ময়কর চোখে সেইদিকে তাকিয়ে থাকি। রিয়ান হাতটা সরিয়ে নিতে চাইলে আমি এইবার টেনে বসি। তারপর জায়গাটা ধরতেই বুঝে যাই এইটা ফেক স্কিন। রিয়ান এইবার চেঁচিয়ে উঠে,
.
— কি করছো কি? হাত ছাড়!
.
— আপনি হাতে ফেক স্কিন পড়ে আছেন কেন? কি লুকাতে চাচ্ছেন?
.
— ককিছু ননা। ততুমি হাতটা ছাড়!
.
আমি এইবার কিছু না বলে একটানে ফেক স্কিনটা খুলে ফেলি আর সাথে সাথে আমার চোখের সামনে সেই ছুড়ি দিয়ে খোঁদাই করে লিখা “রিয়ানা” নামটি ভেসে উঠে।
পরবর্তী পর্ব পড়তে পেইজটি তে লাইক দিয়ে সাথেই থাকুন