পাহাড়ের আঁকা বাঁকা উঁচু নিচু পাহাড়ি পথ ধরে হেটে চলেছি আমি আর রিয়ান। চারপাশে শুধু গাছ আর গাছ। দেখতে মনে হচ্ছে ঘন জঙ্গলের মতো। সূর্যের তীক্ষ্ণ রশ্মি জমিনের সাথে মিলিত হতে চাইলে, গাছের পাতা এসে তাতে বাধা সাজে। কিন্তু তাও রশ্মি গুলো হার না মেনে কোন এক ফাঁকা জায়গা দিয়ে ঠিকই এসে মিলিত হয়েছে জমিনের সাথে।
রিয়ান আর আমি চুপচাপ হেটেই চলেছি। মাঝে মধ্যে দুই এক কথা এই নিরবতা ভাঙতে বেরিয়ে আসে। সেখানে যাওয়ার জন্য কোন যানবাহন নেই বলে হেটেই যেতে হচ্ছে আমাদের।
প্রায় ২ ঘন্টা যাবৎ হেটে চলেছি। আর চলছে না শরীর কিন্তু কিছু বলতেও পারছি না। ভাবছি ড. রিয়ান যদি আবার কিছু বলে। তখনই সকাল বেলার মুডের কথাটা মনে পড়ে গেল।
.
.
পাহাড়ি এক গ্রামে কিছু লোক অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমাদের সেখানে যাওয়ার জন্য বলা হয়। তাই আমি, রিয়ান আর হারুন যাব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সব কিছু রেডি করে যেই না বের হতে যাব ঠিক তখনই হারুন এসে বলে ও যেতে পারবে না। ওর নিমোনিয়া হয়ে গিয়েছে।
এইটা শুনে ড. রিয়ান যে পরিমাণ রেগে গিয়েছিল। পুরো ক্যাম্প মাথায় তুলে ফেলেছিল। এই ফাস্ট তাকে এতটা রাগতে দেখেছিলাম। হারুন বাদে সকলকেই কাজে ব্যস্ত ছিল বলে আমাকে আর রিয়ানকে একাই আসতে হয়।
.
.
এইসব মনে করতেই গা শির শির করে উঠে। ভাইরে ভাই এত রাগ পায় কোথা থেকে কে জানে! রিয়ান তখন যেই পরিমাণ রেগে ছিল মনে হচ্ছিল হারুনকে খুনই করে ফেলবে। এইসব ভেবে অন্যমনস্ক হয়ে হাটছি, হুট করেই গাছের শিকরের সাথে পা বেজে পড়ে যেতে নিলে রিয়ান আমার ধরে ফেলে। আমি চোখ তুলে রিয়ানের দিকে তাকাই। রাগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দেখে মনে হচ্ছে যে আমায় এখনই কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। আমি ভয়ে তারাতাড়ি নিজেকে সামলিয়ে উঠে দাড়াই। রিয়ান কিছুটা চেঁচিয়ে বলে।
.
— ইউ আর জাস্ট ইম্পসিবল!! চোখ কি হাতে নিয়ে ঘুরো নাকি!! যখন তখন খালি পড়েই যাও। ঠিক মত চলাফেরা করা যায় না!!
.
আমি একটা কিউট টেডি ওয়ালা ইনোসেন্ট ফেশ করে রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলি।
— I am tired. আর হাটতে পারছি না। একটু বসি না প্লিজজ!!
.
রিয়ান আমার দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে থাকে। আমি একদম কিউট টেডি ফেশ করে দাড়িয়ে আছি। রিয়ান কিছু একটা ভেবে নিজের হাতের ঘড়ির দিকে একবার তাকায়। তারপর গম্ভীর গলায় বলে।
.
— ওকে দেন। ১৫ মিনিট রেস্ট করে নাও।
.
আমার খুশি আর দেখে কে ধপ করেই পাশের গাছের শিকড়ের উপর বসে পড়ি। আহহ কি শান্তি!! মনে হচ্ছে কত বছর ধরে বসি না। আমি গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে থাকি। সতেজ ভরা এক নিশ্বাস নেই।
রিয়ানের কথা মনে পড়তেই চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি সে পকেটে হাত দিয়ে আছে। আমি ভ্রু কুচকিয়ে বলি।
.
— আপনাকে আলাদা করে আপায়ন করে বসতে বলতে হবে!!
.
— টায়ার্ড তুমি আমি না! সো তুমিই বসো। আ’ম ফাইন। গম্ভীর গলায়।
.
— খারুস বেটার খারুস কথা!! মিন মিন করে।
.
— তুমি কি কিছু বলেছো??
.
— আব কই না তো!! কিছুটা হকচকিয়ে গিয়ে।
.
— ওকে।
আমি চোখ বন্ধ করে বসে থাকি। হঠাৎ হাতে সুরসুরি অনুভব করি। তাই চোখ খুলে তাকিয়ে দেখতে নেই আসলে কি!! চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি কেটাপিলার। দেখার সাথে সাথে দেই এক চিৎকার। আর উঠে দাড়িয়ে হাত বার ঝাঁকাতে থাকি আর লাফাতে থাকি। আমার চিৎকার শুনে রিয়ান দ্রুত আমার কাছে এসে দাড়ায়। কিছু বলতে যাবে তার আগেই আমি তাঁকে জড়িয়ে ধরি। ভয়ে গা শির শির করছে।
আমার এমন কাজে রিয়ান হতভম্ব হয়ে যায়। বুঝে উঠতে পারছে না কি হচ্ছে এইসব। ওর ভিতরে শীতল এক বায়ু বয়ে চলেছে। রিয়ান নিজেকে কিছুটা সামলিয়ে বলে।
.
— কি হয়েছে রিয়ুপাখি!! তুমি এমন করছো কেন??
.
রিয়ানের আওয়াজে আমার ঘোর ভাঙে। আমি বুঝতে পারি আমি তাকে জড়িয়ে ধরে আছি। সাথে সাথে আমি সরে এসে ভয় মিশ্রিত কণ্ঠে বলি।
.
— সরি আসলে হাতের উপর কেটাপিলার ছিল তাই ভয়ে এমন করেছি। মাথা নিচু করে।
.
— ইউ আর রেইলি জাস্ট ইম্পসিবল। এখন এইদিকে আসো!! শান্ত গলায়।
.
— মমমানে!! হতভম্ব হয়ে।
.
— মানে এইযে এইখানে আসো!! গম্ভীর হয়ে
।
.
আমি কাঁপা কাঁপা পায়ে তার সামনে যাই। সে তার ব্যাগ থেকে একটা স্প্রে টাইপ কিছু বের করে আমার হাত ধরিয়ে দিয়ে বলে।
.
— এইটা ইন্সেক্ট স্প্রে। নিজের গায়ে স্প্রে করে নাও। এতে ইন্সেক্টরা তোমার আশেপাশে আসবে না।
.
আমি মাথা দুলিয়ে সারা গায়ে স্প্রে করে নেই। তারপর আবার হাটা শুরু করি।
.
.
??
.
.
গ্রামটা পাহাড়ের একদম মাঝে। সবুজ শয্যাতে রাঙ্গীত গ্রামটি। গ্রামের পরিবেশটাও বেশ ছিপছাপ। বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি তাদের বাসা। পড়নে তাদের অতিসাধারণ কাপড়। চোখে মুখে এক প্রশান্তির হাসি। শহরের কলাহল থেকে একদম দূরে, একদম নীরব একটি পরিবেশ।
আমাদের এইখানে পৌঁছাতে প্রায় বিকেল হয়ে যায়। এসেই লেগে পড়ি আমাদের কাজে।
.
.
.
সব রোগীদের দেখতে দেখতে প্রায় রাত হয়ে যায়।এর ফলে আজ ফিরে যাওয়া সম্ভব না। এত রাতে পাহাড়ি অঞ্চলে চলাচল বেশ সুবিধার না। তাই আমি আর রিয়ান ঠিক করলাম এইখানেই আজ রাতটা থেকে যাব।
গ্রামবাসীরাও আমাদের আপায়ন করতে প্রস্তুত কিন্তু বিপত্তি ঘটলো অন্য জায়গায়।
এই গ্রামে নাকি একটা নিয়ম আছে। বাহির থেকে যদি এই গ্রামে কেউ থাকতে চায় তাহলে নাকি তাদের আগে এই গ্রামের সরদার মিয়াং এর কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। তাই আমি আর রিয়ান গিয়ে হাজির হলাম তার বাসায়। এইখানের এক অধীবাসী একটি ছেলে আমাদের তার বাসায় নিয়ে এসেছে।
আমরা সরদারের বাসায় এসে দেখি কোন এক সভা চলছে। গ্রামের অনেকেই সেখানে উপস্থিত, তাদের থেকে একটু সামনে দুইজন যুবক,যুবতী মাথা নতো করে দাড়িয়ে আছে।
সামনে এক গাছের নিচে ৩ টা চেয়ার। সেই চেয়ারে প্রায় মধ্য বয়স্ক তিন লোক বসে আছে। এইখানে মিয়াং কে তা রিয়ান জানতে চাইলেন। তখন সেই ছেলেটি বলে,
.
— মাঝে বসা লোকটি মিয়াং।
.
আমরা সেইদিকে তাকাতেই দেখি একজন গুরুগম্ভীর প্রকৃতির লোক। মুখ ভর্তি দাড়ি। গায়ের রং কিছুটা চাপা। পড়নে ধুতি আর ফোতুয়ার মত কিছু একটা। সে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সেই যুবক ও যুবতীর উপর নিক্ষেপ করছে।
রিয়ান আর আমি তার কাছে যেতে নিলেই তার হুংকারে দাড়িয়ে পড়ি।
সে তার কড়া দৃষ্টি সেই যুবক যুবতীর দিকে নিক্ষেপ করে বলে।
.
— তোদের সাহস কেমনে হইলো এই গ্রামে বিয়া ছাড়া ঘুইড়া বেরানোর?? তোরা এইখান কার স্থানীয় হইয়াও এই গ্রামের নিয়ম কেমনে লগ্ন করলি?? বল!!
.
— মাফ কইরা দেন সরদার!! আর এমন ভুল হইতো না।
.
— তুই জানস না এই গ্রামে বিয়া ছাড়া কোন ছেলে মেয়ে একসাথে দাড়ানো তহ দূরে থাকুক কথা পর্যন্ত বলতে পারবো না!! যদি কেউ এই নিয়ম ভোঙ্গ করে তাহলে তাগোরে কঠোর থেকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।
সেখানে তোরা হাত ধইরা হাটছোস!! তাহলে বল তোগো কেমনে মাফ করতাম আমি!! শাস্তি তহ তোগো পাইতেই হইবো। চেঁচিয়ে।
.
সেই যুবক যুবতীরা সরদারের পায়ে পড়ে কান্নাকাটি শুরু করে কিন্তু তিনি কিছুতেই মানলেন না। তারপর সরদারটা কাকে যেন ইশারা করে, সাথে সাথে কিছু লোক এসে সেই যুবক আর যুবতিকে ধরে ফেলে। তখন সরদার বলে উঠে।
.
— এগোরে মধ্য রাতে ওই জঙ্গলের গাছের লোগে বাইন্দা আবি। হিংস্র জন্তু এসে ওগোরে খাবলাইয়া খাবলাইয়া খাইলে খাইবো। আর যদি বাইচ্চা যায় তাইলে এগো রে নাওরা করে (টাক করে) গ্রাম থেকে ধাক্কা মেরে বের কইরা দিবি। নিয়ম ভাঙার ফল তো এরা পাইবোই।
আর তোরা কান খুলে শুনে রাখ যদি কেউ এগো বাচাইতে যাস তাহলে তার হাত কেটে ওই পাহাড়ের উঁচু থেকে ফালাইয়া দেওয়া হইবো। এখন এই দুইডা পোলা মাইয়ারে আমার চোখের সামনে থেকে লইয়া যা!! চিল্লিয়ে।
.
এই কথা বলার সাথে সাথে সেই যুবক যুবতীকে টেনে হিছড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সকল গ্রামবাসীরাও চুপচাপ দেখতে থাকে। আমি আর রিয়ান একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছি বার বার। মনের মধ্যে এক আলাদা ভয় কাজ করছে। আমাদের সাথে না জানি কি করে!! আমি রিয়ানকে কিছু বলতে যাবো তার আগে ছেলেটি বলে উঠে।
.
— সরদারররর!! আমগো গ্রামে নতুন দুইখান মানুষ আইসে। এইখানে থাকবার লিজ্ঞা আপনার কাছে অনুমতি লইতে আইসে।
.
সরদার এইবার তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আমগো উপর নিক্ষেপ করে। তারপর কঠোর গলায় বলে।
.
— এইহানে লইয়া আয় হেগোরে!!
.
[ আমি গ্রামের আঞ্চলিক ভাষা তেমন একটা পারি না। যতটুকু জানি তা দিয়েই লিখার চেষ্টা করছি। তাই ভুল হলে তা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
.
না চাওয়া সত্তেও আমাকে আর রিয়ানকে তার সামনে যেতে হয়। দুইজনের মনে কেমন এক ভয় কাজ করছে। রিয়ানও আজ কিছুটা আতঙ্কের মধ্যে আছে। আমরা সরদারের সামনে আসতেই সেই বলে উঠে।
.
সরদারঃ তোমগো নাম কি?? কইত থেইক্কা আইসো?? এইহানে কি কাম তোমগো!!
.
রিয়ানঃ জ্বী আমার ড. রিয়ান আর তিনি হচ্ছে ড. রিয়ানা। আমরা ঢাকা থেকে এসেছি এইখানে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। উকছুঁড়ি গ্রামে আমাদের একটা মেডিক্যাল ক্যাম্পও আছে। সেইখান থেকেই চিকিৎসা দিচ্ছি আমরা। এই গ্রামে নাকি অনেকেই অসুস্থ তাই তাদের চিকিৎসা দিতে এসেছিলাম আমরা। নিচু গলায়।
.
সরদারঃ অহহ ভালা ভালা। ভালা কাম করতাসো তোমরা।
.
রিয়ানঃ কিন্তু সমস্যা হলো এত রাতে এখন আমরা ফিরতে পারছি না। বুঝেন এই তো এত রাতে পাহাড়ি অঞ্চলে চলাচল কতটা বিপদজনক। তাই আজ রাতটা এইখানে থাকতে চাইছিলাম। যদি আপনি অনুমতি দিতেন আর আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতেন!!
.
সরদারঃ তা তো অবশ্যই দিমু কিন্তু তার আগে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিবার লাগবো!
.
রিয়ানঃ কি প্রশ্ন??
.
সরদারঃ তোমগো কি বিয়া হইসে?? তোমরা কি স্বামী-স্ত্রী নি??
.
এর কথা শুনে আমি আর রিয়ান একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকি। দুইজনের মুখে কোন কথা নেই। রিয়ানকে বেশ শান্ত লাগলেও আমি শান্ত হতে পারছি না।
এখন যদি না বলি আর তিনি আমাদের সাথে উল্টা পাল্টা কিছু করে তখন। আমি তো ভয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছি। মনটা কেন জানি বার বার কু ডাকছে। আমি বার বার রিয়ানের দিকে তাকাচ্ছি। রিয়ান তখন একবার আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
.
রিয়ানঃ হ্যাঁ আমাদের বিয়ে হয়েছে। আমরা স্বামী-স্ত্রী। রিয়ানা আমার বউ।
.
কথাটা শুনার সাথে সাথে আমার চোখ বড় বড় হয়ে যায়৷ আমি হা হয়ে রিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকি। এত বড় মিথ্যা!! আমি রিয়ানের হাত চেপে ধরে চাপা গলায় বলি।
.
রিয়ানাঃ এইসব কি বলছেন??
.
রিয়ানঃ মরতে না চাইলে চুপ করে দাড়িয়ে থাকো। একটু আগে দেখো নি কি হয়েছে!! এখন এইটা না বললে মরা ছাড়া উপায় নেই!! So be quite! চাপা গলায়।
.
অন্যদিকে, সরদার সাহেব কথাটা শুনে যেন খুশিই হলেন মনে হয়। সে মুখে এক হাসি নিয়ে বলেন,
.
সরদারঃ তাই তো কোন সমস্যাই নাইক্কা। তোমরা যখন স্বামী স্ত্রী তখন তোমরা এইখানে থাকবার পারো। আমার কোন আপত্তি নাই।
.
তখন তার পাশে থাকা দুই ব্যক্তির একজন বলে উঠে,
.
— এত তারাতাড়ি বিশ্বাস করবার নাই সরদার। এরা তো মিথ্যাও কইবার পারে!! শহরের মানুষ গো বিশ্বাস করবার নাই জানো না?
আসলে যদি এরা স্বামী স্ত্রী না হয় তখন আমগো কত বড় পাপ হইবো ভাবসো!! নিচু গলায়।
.
— এমন তো ভাবি নি??
.
— তো এখন ভাবো!! এগো রে কও এগো কাছে কোন প্রমাণ আছে নাকি যে তারা স্বামী স্ত্রী?? নিচু গলায়।
.
— হুম। তা ড. রিয়ান তোমগো কাছে কোন প্রমাণ আছে নি যে তোমরা স্বামী স্ত্রী??
.
কথা শুনার সাথে সাথে আমার হাত পা কাঁপা শুরু হয়ে যায়। এখন কি হবে এই ভেবে!!
রিয়ানের মুখেও কিছুটা ভয়ে ছাপ দেখা যাচ্ছে। তাও রিয়ান কিছুটা সাহস নিয়েই বলে।
.
রিয়ানঃ না!! আর থাকবেই বা কেন?? এইখানে তো আমরা সকলের চিকিৎসা করতে এসেছি তো নিজেদের বিয়ের প্রমাণ নিয়ে ঘুরার তো কথা না আমাদের তাই না??
.
সরদারঃ কথাটা তো ঠিক কইছো কিন্তু কি নিশ্চয়তা আছে যে তোমরা মিথ্যা বলছো না??
.
রিয়ানঃ আজব তো আমরা মিথ্যা কেন বলবো?? মিথ্যা বলে লাভ কি?? আর যদি আমার কথা বিশ্বাস না হয় তাহলে রিয়ানাকে জিজ্ঞেস করেন যে ও আমার স্ত্রী কি না??
.
কথা শুনে আমি হকচকিয়ে যাই। আমারে কেন টানতাসে এইটাতে। আমি রিয়ানের দিকে বড় বড় করে তাকিয়ে আছি। কি করবো বুঝতে পারছি না। হাত পা রীতিমতো কেঁপেই চলেছে। সরদার আমার দিকে একবার তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করে বলে,
.
সরদারঃ এই পোলা কি সত্যি তোমার স্বামী??
.
কি বলবো বুঝতে পারছি না। ” হ্যাঁ ” যে বলবো তাও বলতে পারছি না। গলা ধরে আসছে। রিয়ান আস্তে করে আমার হাত ধরে। আমি রিয়ানের দিকে তাকতেই রিয়ান চোখ দিয়ে আমায় আশ্বস্ত করে “যে আছে। আমি যাতে ভয় না পাই আর হ্যাঁ বলে দেই”। আমি এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে শুধু মাথা দুলাই।
.
তখন আবার সরদারের পাশে থাকা ব্যক্তিটি বলে উঠে।
— সরদার আমার তো এখন কেন জানি সন্দেহ হইতাসে।
.
— তো কি করবো?
.
— এক কাজ করেন এগো আবার আমগো সামনে বিয়া দিয়া দেই। তাইলে আর কোন সন্দেহ থাকবো না।
.
— হো ভালা কথা কইসো। এইটা করা হোক।
.
কথাটা শুনে আমি আর রিয়ান মূর্তির ন্যায় দাড়িয়ে থাকি। কি হচ্ছে এইসব কিছুই মাথায় ঢুকছে না। কি থেকে কি হচ্ছে!! সব কেমন যেন ধোঁয়াশা লাগছে।
তখন সরদার বলে,
.
সরদারঃ তোমগো আমাগো সামনে আবার বিয়া করোন লাগবো!!
.
রিয়ানঃ না!! এইটা সম্ভব না!!
.
সরদারঃ কেন??
.
রিয়ানঃ না মানে.. যেখানে আমাদের একবার বিয়ে হয়েছে সেখানে আবার বিয়ে কেন করতে যাব আমরা??
.
সরদারঃ সমস্যা কোথায়?? বিয়া তো হইসেই তাইলে আবার বিয়া করতে সমস্যা কি?? নাকি তোমরা বিয়ে করো নাই??
.
রিয়ানঃ না আমরা বিবাহিত।
.
সরদারঃ তাইলে তহ হইলোই!! আমি কিছু শুনবার চাই না। তোমগো এখনই আমগো সামনে বিয়া করা লাগবো নাইলে এইহানে থেকে বের করে দেওয়া হইবো!!
.
রিয়ানঃ আমার কথ….
.
সরদারঃ কোন কথা না!! তোমরা মুসলিম নাকি অন্য ধর্মের??
.
রিয়ানঃ আমরা মুসলিম কিন্তু…
.
সরদারঃ ব্যাস!! আর কিছু কোওয়া লাগবো না। ওই যা তো কাজী রে ডাইক্কা লইয়া আয়। আজ এইখানে বিয়া হইবো!!
.
.
রিয়ান বিভিন্ন ভাবে তাদের বুঝাতে চেষ্টা করছে কিন্তু তারা বুঝতে নারাজ। এইদিকে আমি মূর্তির ন্যায় দাড়িয়ে আছি। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার মাথা ঘুরছে। হাত পা যেন অবশ হয়ে আসছে। দাড়িয়ে থাকাটাও দায়ভার হয়ে উঠেছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজী এসে পড়লো। গ্রামের মহিলারা মিলে ধরে আমায় এক চেয়ারে বসালো আরেক চেয়ারে রিয়ানকে। আমাদের মাঝে একটা পর্দা টানা হলো। একজন এসে আমার মাথায় ঘুমটা দিয়ে দেয়। আমি নির্বাকের মতই বসে থাকি। কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না আমার মুখ দিয়ে।
এখানে রিয়ান বার বার তাদের বুঝাতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না।
এইদিকে, কাজী আমাদের নাম, বাবা-মার নাম, ঠিকানা, দেনমোহর সব লিখে বিয়ে পড়ানো শুরু করে দেয়। এইবার সকলেই আমাদের উপরে একবারে ঝেঁকে পড়ে ।
.
এরপর কাজী রিয়ানকে “কবুল” বলতে বলে। রিয়ান কিছু বলছে না দেখে সরদার জোরাজুরি শুরু করে। রিয়ান এক প্রকার বাধ্য হয়ে “কবুল” বলে।
তারপর আমাকে “কবুল” বলতে বলা হয়। আমি সেই আগের ন্যায় নির্বাকের মত বসে আছি। এতে সকলে এখন আমার সাথেও জোড়াজুড়ি শুরু করে। আমি নিজের সামনে অন্ধকার দেখছি। এর বাদে কিছু না। কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। শেষে না পেরে আমিও “কবুল” বলে ফেলি। সকলেই হই-হুল্লোড় করে উঠে।
সম্পূর্ণ হয় আমাদের বিয়ে। আমরা আবদ্ধ হয়ে যাই এক নতুন সম্পর্কে। শুরু হয় আমাদের জীবনের নতুন অধ্যায়।
.
.
??
.
.
বদ্ধ এক রুমে চুপচাপ বসে আছি। কিছুক্ষন আগেই গ্রামের মহিলারা এসে আমায় খাটে বসিয়ে দিয়ে চলে যায়। আমি সেই মূর্তি ন্যায় বসে আছি একদম নির্বাক।
মাথা আমার পুরো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে কিছুক্ষণ আগেই আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তাও আবার রিয়ানের সাথে। রিয়ান এখন আমার স্বামী। এখনো সব কিছু আমার কাছে ধোঁশায় এই মনে হচ্ছে।
আমি যখন এইসব ভাবছি তখন দরজা খুলার আওয়াজ পাই। আমি সেইদিকে তাকিয়ে দেখি কিছু লোক রিয়ানকে জোর রুমের ভিতর ঢুকিয়ে চলে যায়।
রিয়ান এইবার মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে। হয়তো অনুতাপে ভুগছে। আমি মাটির দিকে তাকিয়ে থাকি। বেশ কিছুক্ষণ আমাদের মধ্যে নিরবতা কাজ করে।
রিয়ান সেই নিরবতা পেরিয়ে বলে উঠে।
.
— দেখো রিয়ু যা হয়েছে তা এক্সিডেন্টলি। এতে আমার কিছু করার ছিল না। আমি তো আমাদের বাঁচানোর জন্য এই মিথ্যা বলেছিলাম কিন্তু তারা যে এমন কিছু করবে তা বুঝতে পারি নি। আমি অনেক চেষ্টা করেছি এই বিয়েটা থামানো কিন্তু পারি নি। সরি!!
.
আমি আগের ন্যায় বসে থাকি। কিছু বলি না। তা দেখে রিয়ান বলে।
.
— আমার হাতে তখন কিছু ছিল না। এখন এইটা কে ভাগ্য বলা ছাড়া আমার আর কিছুই বলার নেই। আমাদের ভাগ্যে হয়তো এইটাই ছিল। তোমার আর আমার বিয়ে। বলে এক দীর্ঘ শ্বাস নেয়।
.
আমি সেই আগের মতই চুপ। তা দেখে রিয়ান আমার কাছে এসে বলে।
.
— রিয়ু কিছু তো বল!! তোমার এই চুপ থাকাটা আমি মেনে নিতে পারছি না। Please say something!! রিয়ুপাখি!!
.
আমি এইবার মুখ তুলে রিয়ানের দিকে তাকাই। রিয়ানের মুখটা একদম মলিন হয়ে আছে। চোখ মুখে ক্লান্তির ছাপ। আমি এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলি।
.
— I want divorce!!