হুট করে দুইজনে একই সাথে একই তালে চেঁচিয়ে উঠে।
.
— কিইইইইইই
.
আমি ওদের থেকেই এমন একটা চিৎকার এই আশা করেছিলাম তাই আগে ভাগে নিজের কানে হাত দিয়ে বসে ছিলাম। ওদের চিৎকার দেওয়ার শেষে নিজের কানের থেকে হাত সরিয়ে একবার চারপাশ ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিলাম। যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই, সকলেই এলিয়েন দেখার মত তাকিয়ে আছে।
আমি সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে ওই দুইটা বান্দরনীদের দিকে তাকালাম। সাথে সাথে আমার ভ্রু দুটো কুচকিয়ে এলো।
দুইজনেই তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আমার দিকে নিক্ষেপ করে বসে আছে। তা দেখে আমি কিছুটা নড়েচড়ে বসি। গলাটা একটু পরিষ্কার করে বলি।
.
— কি এইভাবে তাকিয়ে আছিস কেন তোরা??
.
— তুই একটু আগে কি বললি?? (আরিশা)
.
— সত্যি তোর বিয়ে? মানে কেমনে? হাও? তুই প্রেম কবে করলি? (রিংকি)
.
— আজিব তো এতটি প্রশ্ন একসাথে করলে উত্তর দিব কিভাবে??
হ্যাঁ আগামী মাসের ৫ তারিখ আমার বিয়ে। আর আমি প্রেম করে বিয়ে করতাসি না।
.
— তাইলে কেমনে কি? (আরিশা)
.
— যেমনে এই।
.
— পোলা কেরে দোস্ত?? মানে আমাদের জিজু কে গো?? দেখ বইন আমার জিজু যদি হ্যান্ডসাম না হয় তাইলে আমি তালাক দিয়া দিমু আগেই বইলা রাখলাম। (রিংকি)
.
— তুই তালাক দিবি মানে?? ভ্রু কুচকিয়ে।
.
— আরেহ জানস না, ” শালি মানে আধিঘারওয়ালি।” তো ওই হিসাবে আমি তার হাফ বউ। যদি আমার জিজু পছন্দ না হয় তাইলে তালাক দিমু আমি। ভাব নিয়ে। (রিংকি)
.
— শাকচুন্নি, তুই আসোস তোর আলগা পেচাল নিয়া। আর কাজ কাম নাই খালি বিয়া সাদি নিয়া পইড়া থাকস!! লজ্জা করে না অন্যের বরের দিকে নজর দিতে??
ওর কথা বাদ দে রিয়ানু, আগে এইটা বল ছেলেকে?? কি করে?? কোথায় থাকে? তোদের পরিচয় কিভাবে?? (আরিশা)
.
— তোরা তাকে চিনিস!! আসলে বলতে গেলে অনেক ভালো করেই চিনিস।
.
এইবার দুইজন দুইজনের দিকে হ্যাবলার মতো তাকাতে থাকে। মানে কিছুই বুঝতে পারছে না তারা। দুইজন একসাথেই বলে,
.
— কে সে??
.
আমি এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে কান দুটো চেপে ধরে বলি।
— ড. সাদাত খান রিয়ান মানে ড. রিয়ান।
.
নাম শুনার পর দুইজনেই স্থির। আমি কোন চিৎকার না পেয়ে কানের থেকে হাত সরালাম। রিংকি থম মেরে বসে আছে। আরিশা আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি প্রথমে রিংকির সামনে তুরি বাজাই। না কোন সারাশব্দ নেই। তাই হাল্কা করে ওকে ধাক্কা দেয়। সাথে সাথে ও আরিশার ওপর পড়ে যায় আর আরিশা তাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে যায়। সাথে রিংকিও। এইবার রিংকির হুস আসে। সে তাড়াহুড়ো করে উঠতে নিলে মাথায় টেবিলের সাথে বারি খায়। আবার গিয়ে পড়ে আরিশা উপর।
আরিশা এইবার হাল্কা চেঁচিয়ে উঠে।
— অহহ মাগো!! এই মুটকি উঠ!! আমারে তুই চ্যেপ্টা করে দিলি। উঠ হারামি!! (আরিশা)
.
— তুই মুটকি!! তোর চৌদ্দ গুষ্টি মুটকি। ভেংচি কেটে। (রিংকি)
.
আমি ওদের কান্ডকারখানা দেখে হাসতে হাসতে শেষ। তারপর কোন মতে হাসি থামিয়ে রিংকিকে উঠে দাড়াতে সাহায্য করি।
.
[ রিংকি এর মত অবস্থা আমার একবার হয়েছিল। বাট ওইটা স্কুলে। খুশির জোরে শকড হয়ে বেঞ্চ উলটিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। কি লজ্জা!! কি লজ্জা!! ?]
.
রিংকি আর আরিশা বসে চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে সবাই ড্যাবড্যাব করে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে তারা এইবার নিশ্চয়ই ভাবছে এরা কোন পাগলগরাদ থেকে ছুটে এসেছে। আরিশা তা দেখে বলে।
.
— এইখানে কি Beauty contest হচ্ছে?? এইভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছেন কেন?? নিজের কাজে মন দিন। হুহ যতসব আজাইরা পাবলিক। [বিঃদ্রঃ ইহা আমার ফেমাস কোমন ডাইলোগ?]
.
সবাই এইবার চোখ ঘুরিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমি এইবার রিংকি এর দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে যাই। রিংকি পুরা কাদো কাদো হয়ে আছে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বলি।
.
— কি??
.
— বইন তুই কো এইটা মিথ্যা!! কেহে দে ইয়ে জুট হ্যায়। মেরা ক্রাসের সাথে বিয়ে করতে পারিস না। আমারে এত বড় ছেঁকা দিস না দোস্ত। তোর আমার লিপস্টিকের কসম। (রিংকি)
.
— সরি টু সে বাট ইহা একটি সত্যি কথা। আমার আর রিয়ানের সত্যি বিয়ে!
.
— নেহি!! ইয়ে নেহি হো সাকতা!! মে লুট গায়ি, বারবাত হো গায়ি। আমার ক্রাস আমার জিজু!! মানি না আমি কিছুতেই মানি না। নেকা কান্না করে। (রিংকি)
.
— ওই শাকচুন্নি চুপ!! এত অভারড্রামা করোস কেমনে?? স্টার জলসার দোকান। দ্বারা আন্টিরে বইলা তোর টিভি দেখা অফ করাইতাসি।
আর এইযে রিয়ানু সোনা এইদিকে তাকান। এইসব কি হ্যাঁ?? কেমনে কি?? পুরো হিস্টোরি বল? নাইলে আজ তোর শরীর এই ক্যাফে থেকে আস্ত যাইতে পারবো না। (আরিশা)
.
— হুহ!! বলতাসি। শুন তাহলে..
অতঃপর পুরো রামায়ণ কাহিনি বলতে থাকে। শুধু বিয়ের কাহিনিটা লুকিয়ে যায়। তার জায়গায় বলে রিয়ান ওকে প্রোপস করেছিল। আর রিয়ানা তা এক্সেপ্ট করে।
সব শুনে আরিশা বলে।
.
— তলে তলে টেম্পু চালিয়ে চলেও গেসো আর আমাদের এখন জানাও!! শরম করে নির্লজ্জ মাইয়া!! (আরিশা)
.
— বইন আমার কি দোষ!! তখন তো ক্যাম্পে ছিলাম। কিভাবে তোদের জানাতাম বল?
.
— তোরা কাজটা ঠিক করলি না। তোরা ঠিকই মিঙ্গেল হয়ে গেলি কিন্তু আমারে ওই অসহায় নিরিহ সিঙ্গেলই রাইখা দিলি। আল্লাহ এই অন্যায় সইতো না। এই নিরিহ সিঙ্গেল মাইয়ার অভিশাপ তোরা ২০ ডজন বাচ্চার মা হবি। (রিংকি)
.
আমি ভ্রু কুচকিয়ে রিংকি এর দিকে তাকাই। তারপর বলি।
.
— তোরা মানে?? আমি আর কে?
.
— তুই আর আ… উম উম।
রিংকি আর কিছু বলার আগেই আরিশা ওর মুখ চেপে ধরে। আর দাঁতে দাঁত চেপে বলে।
.
— চুপ কর শাকচুন্নি!! খালি বেশি বেশি কথা বলস!! একটু চুপ থাকলে কি হয়??
.
— ওই আরিশা কি লুকাচ্ছিস বল!! নাইলে আজ তোর খবর আছে! বল বলছি!
.
আরিশা এইবার রিংকির মুখ ছেড়ে দিয়ে নিজের ঠোঁট জ্বিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে। তখন রিংকি ফট করে বলে উঠে।
.
— ড. সিয়ামের সাথে আরিশা ইটিসপিটিস চলছে।
.
সাথে সাথে রিংকির পিঠে পড়ে এক বারি আর তারপর পড়ে আরিশার পিঠে। আরিশা এইবার অসহায় একটা চেহেরা নিয়ে আমার দিকে তাকায়। আমি চোখ শক্ত করে বলি।
.
— আমারে তো কত কিছু কইলা তুমি!! এখন আমি কই?? হারামী!! তুই নিজে প্রেম করোস তা আমারে বলোস নাই আর এখন আবার আমায় জ্ঞান দাও। নির্লজ্জ মহিলা!!
.
— আব কেমনে কেমনে জানি প্রেম হয়ে গেল। হেহে!! ( আরিশা)
.
— তোদের প্রেম এমনে এমনেই হয়ে যায়। আর আমারটা হয় না কেন? (রিংকি)
.
— তুই আগে একটারে ঠিক কর তারপর প্রেম করিস। তুই তো উঠতে বসতে খালি ক্রাস এই খাস। তোর কোনদিন একটা ছেলেরে ভালো লাগে?? (আরিশা)
.
— বুঝলি রিয়ানু!! আজ সিঙ্গেল বলে কেউ পাত্তা দেয় না। নিজের আপন বান্ধুবি গুলোও তখন কোকিলা মদি হয়ে যায়। আবার এখন কেউ একটু ট্রিটও দিব না। চাইয়া চাইয়া খাইতে বুঝি এখন আমার শরম করে না। নেকা কান্না করে। (রিংকি)
.
— ওরে আমার লজ্জা বতি রে!! (আরিশা)
.
— আরেহ ভাই!! তোরা এত মেলোড্রামা কেমনে করোস?? ট্রিট লাগবো তো!! যা আজকের ট্রিট আমার পক্ষ হতে।
.
এইবার দুইজনেই খুশিতে লাফিয়ে উঠে। খাওয়া দাওয়া শেষে বলি।
.
— আচ্ছা শুন, তোরা কিন্তু কালকেই আমার বাসায় এসে পড়বি!! যেহেতু আমার ফ্যামিলির কেউ নেই তাই তোরাই এখন আমার ফ্যামিলি। আমি তো একা তাই এইসব ফাংশন করার মত কেউ নেই। চাইলে আঙ্কেল আন্টিকে নিয়ে আসিস। কোন পেরা নেই।
.
— এইটা আবার বলা লাগে?? তুই না বললেও আমরা চলে আসতাম। আর দেখিস আব্বু আম্মু নিউজটা শুনলে অনেক খুশি হবে। চিন্তা করিস না তোর বিয়ের সকল কিছুর দ্বায়িত্ব আমাদের। একদম ধুমধামসে বিয়ে দিব তোর!! (আরিশা)
.
— আর কে বলেছে তুই একা?? আমরা আছি কি করতে? তোর ফ্যামিলি হলাম আমরা বুঝলি!! নেক্সট নিজেকে একা বললে দিব এক চড়!!
সব ফাংশন মানাবো আমরা দেখিস। আমাদের একমাত্র বান্ধবী প্লাস আমার এক্স ক্রাসের বিয়ে বলে কথা। তোর ফ্যামিলি আমরাই বুঝলি।
.
ওদের কথা শুনে চোখে কোনে খুশির অশ্রু এসে পড়লো। আমি ওদের দুইজনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেই। ওরা দুইজনও আমায় আগলে নেয়। আমি এইবার একটু স্বরে এসে বলি।
.
— রিংকি এইবার তোর লিপস্টিক ঠিক কর আর আরিশা নিচ থেকে মোবাইল তুল।
.
— অহহ হো!! আমার তো নতুন ড্রেস কিনতে হবে! মেকাপও কিনতে হবে। ধুর!! আচ্ছা আমি এখন গেলাম বাই!! (রিংকি)
কিন্তু সে দরজার দিকে না গিয়ে গেল ওয়াসরুমে ওর মেকাপ ঠিক করতে।
.
আরিশা ফোন তুলে বলে,
.
— ধুর মোবাইল বন্ধ হয়ে গেছে। বাসাই গিয়ে দেখতে হবে ঠিক আছে কিনা। আচ্ছা এখন যাই তোর বিয়ের অনেক কাজ আছে বুঝলি।
.
— চল একসাথে বের হই।
.
আমরা বের হতে নিলে রিংকিও এসে পড়ে। তাই একসাথেই তিনজনে বের হয়ে যাই।
.
[ বন্ধুর আরেক নাম ভালবাসা। যাদের এমন বন্ধু ঠিক তারাই বুঝবে বন্ধুত্বের আসল মানে। খুব মিস করছি নিজের বন্ধু-বান্ধবদের। আজ ওরা পাশে থাকলে হয়তো আমরা সকলেই হৈ-হুল্লোড়ে মেতে থাকতাম। ]
.
.
??
.
বাসায় এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেই। টিউশনি গুলো না করে এসেছি। রিয়ান চায় না আমি এখন আর টিউশনি করি। তাই আমিও আর না করি নি তাকে।
চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলাম। তখনই হুট করে মাথায় আবিরের নামটা খেলে উঠে। আমি চট জলদি চোখ খুলে বসি। রাঙামাটিতে ওই ঘটনার পর আর আবিরের সাথে যোগাযোগ হয়নি আমার। আসলে ওর কথা মনেই ছিল না। মাঝে শুনেছিলাম সে নাকি ঢাকায় ফিরে গিয়েছে। তাই এই বিষয় নিয়ে এত ঘাটাঘাটি করেনি।
কিন্তু ঢাকায় এসেছে আজ ৫ দিন হতে চললো!! আবিরের কোন খোঁজ নেই। এমন তো কখনো হয় নি। আবির সবসময় নিজ থেকেই আমায় ফোন করে। এইবার কি হলো কে জানে।
আমি মোবাইল হাতে নিয়ে ফোন দেই আবিরকে। কিন্তু তার নাম্বার অফ। তাই সূর্যের নাম্বারে ফোন দেই। কোন এক সময় এক কাজে ওর নাম্বার নেওয়া হয়েছিল। যা আজ কাজে লাগছে।
ফোন তার আপন গতিতে বেজেই চলেছে। প্রথম বারের মত ফোন কেটে গেল। দ্বিতীয়বার ফোন দেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই এক পুরুষের কন্ঠে কানে ভেসে আসে।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করি সে সূর্য কিনা? সে প্রতিউত্তরে হ্যাঁ সূচক উত্তর দেয়। আমি আমার পরিচয় বলে আবিরের খবর জানতে চাই। অতঃ সূর্য যা বললো তাতে আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। পায়ের তল থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছিল আমার।