সিজন 1 অধ্যায় 41 থ্রিলার আবেগঘন মুহূর্ত #বিদায় #পজেসিভ নায়ক রিয়ানা রহমান সাদাত খান রিয়ান সিয়াম ইশান

মৃত্যুফাঁদ ও বিদায়ের কান্না

11 মিনিট পড়া 1,654 শব্দ
মৃত্যুফাঁদ ও বিদায়ের কান্না

কানে কিছু শব্দ এসে বারি খেতেই উপরের দিকে তাকাই। হুট করেই চারদিকে এক চাঁপা আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে,

.

— “আয়ায়ায়ায়া”

.

বেশ কিছুক্ষণ পার হয়ে যায় আমি চোখ বন্ধ করে বসে আছি। আমার কোন কিছু না হওয়ায় আমি পিটি পিটি করে চোখ খুলি আর উপরে তাকিয়ে দেখি ঝুমুরটা আমার থেকে প্রায় ২ ইঞ্চি উপরে ঝুলছে। তা দেখে ভয়ে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল।

তখন ঝুমুরটি নিচে নামতে দেখে ভয়ে আমি চিৎকার দিয়ে উঠি আর চোখ বন্ধ করে বসে থাকি।

রিয়ান এতক্ষণ মূর্তির ন্যায় দাড়িয়ে ছিল। ওর চোখের সামনে যেন এতক্ষণ অন্ধকার ছেঁয়ে ছিল। সময়টা যেন থেমে গিয়েছিল। ড. সিয়াম ধাক্কা দিতেই রিয়ানের হোস হয় আর সে দৌড়ে রিয়ানার কাছে যায়।

রিয়ান আমার কাছে এসে আমার হাত ধরে টান দিয়ে সেই জায়গা থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে তারপর সকলের সামনেই জড়িয়ে ধরে। আর বলতে থাকে,

.

— রিয়ুপাখি তুমি ঠিক আছো তো? কিছু হয় নি তো তোমার!

.

আমি এতক্ষণ ভয়ে থরথর করে কাঁপছিলাম। কিন্তু রিয়ানের ছোঁয়া পেতেই সকল ভয় দূর হয়ে যায়। আমি কোন মতে নিজেকে সামলিয়ে ধীর কণ্ঠে বলি,

.

— আমি ঠিক আছি রিয়ান। আপনি শান্ত হন।

.

রিয়ান এইবার আমায় ছেড়ে আমাকে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে নেয়। আমাকে ঠিক দেখে সে এক দীর্ঘ শ্বাস নেয়। তখনই আরিশা আর রিংকি এসে জিজ্ঞেস করতে শুরু করে,” আমি ঠিক আছি কিনা? কোথাও লেগেছে কিনা? ”

আমি দুইজনকেই সম্মতি জানাই। ওরা দুইজন আমায় দ্রুত নিচে নিতে এসে একটা চেয়ারে বসায় আর ওয়েটারকে পানি আনতে বলে।

এই দিকে রিয়ান চেঁচিয়ে বলতে থাকে,

.

— ড. সিয়াম!! ইশান!!

.

রিয়ানের ডাকে ড. সিয়াম আর ইশান দ্রুত ওর কাছে চলে আসে৷ রিয়ান তাদের দেখে কড়া গলায় বলে,

.

— পার্টি মেনেজমেন্টের লোকদের ২ মিনিটের মধ্যে আমার চোখের সামনে হাজির করো। তা না হলে খুব খারাপ হবে।

.

সিয়াম আর ইশান বেশি কথা বলে তাদের আনতে চলে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা দুইজন পার্টি মেনেজমেন্টের লোকদের নিয়ে হাজির হয়। রিয়ান তাদের দেখে চেঁচিয়ে বলে,

.

— হোয়াট দ্যা হেল ইজ দিস? এই আপনাদের ব্যবস্থাপনা! আজ আরেকটু হলে এইখানে কি ঘটতে যাচ্ছিল আপনারাও বুঝতে ও পারছেন? আপনাদের আমি ঠিক কি হাল করতে তা আপনারা জানেনও??

.

— উই আর সরি স্যার। এইটা কিভাবে হলো কে জানে? আমরা তো বার বার সব কিছু চেক করেছিল। বিশেষ করে ঝুমুরটা। এর মধ্যে আমরা ৩ টা প্যাঁচ দিয়েছিলাম যাতে না ছুটে কিন্তু ভাগ্য বসতো ২ টা প্যাঁচই খুলে যায় যার জন্য ঝুমুরটা নিচে নেমে আসে। ভাগ্যবসত ৩ নাম্বার প্যাঁচটি খোলার আগেই আমাদের টিম এসে তা ধরে ফেলে। (মেনেজার)

.

রিয়ান রাগের মাথায় তাকে কষিয়ে একটা চড় মেরে দেয়। তারপর রাগে ফুসফুস করতে করতে বলে,

— আপনারা জানেন আজ আপনাদের এই কেয়ারলেসনেসের জন্য ঠিক কি হতে চলেছিল? আরেকটু দেরি হলেই আমি আমার রিয়ুপাখিকে চিরতরের জন্য হারিয়ে ফেলতাম। বুঝতে পারছেন আপনি??? বলে মেনেজারের কলার ধরে টানে।

.

এইসব দেখে সিয়াম এসে রিয়ানকে সরিয়ে আনে। তারপর মেনেজার আর সেই লোকদের চলে যেতে বলে। তারপর রিয়ানকে শান্ত করতে থাকে,

.

— রিয়ান নিজেকে ঠান্ডা কর। যা হয় নি তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। দেখ রিয়ানা ঠিক আছে। তাই এখন তুই শুধু ওর নিয়ে ভাব। যা হওয়ার ছিল তা হয়েছে এখন তা একটা দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যা। আর এমনেও দেখ রিয়ানা কেমন ভয় পেয়ে আছে। তুই যদি এখন এমন বিহ্যাভ করিস তাহলে তো ও আরও ভয় পেয়ে যাবে। তাই নিজেকে শান্ত কর।

.

সিয়ামের কথায় রিয়ান এইবার রিয়ানের দিকে তাকায়। দেখে রিয়ানা ভিতু চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। রিয়ান নিজের রাগকে সংযত করার চেষ্টা করতে থাকে। তা দেখে সিয়াম বলে,

.

— Take a deep breathe and relax. Calm down your mind.

.

রিয়ান এইবার নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে তারপর রিয়ানার দিকে অগ্রসর হলো।

আমি এতক্ষন অবাক চোখে রিয়ানের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। রিয়ানকে আমি কখনো এতটা রাগতে দেখি নি। কেমন হিংস্র হয়ে উঠেছিল সে। রিয়ানের সেই রুপের কথা মনে করতেই শরীরে কাটা দিয়ে উঠছিল। কিন্তু অতঃপর নিজেকে এই বলে শান্তনা দিতে থাকি যে,

— ” তিনি আমায় প্রচন্ড রকমের ভালবাসেন বলেই তার মধ্যে আমাকে হারানোর ভয় ঢুকে গিয়েছিল। যার ফলে তিনি এমন হিংস্র হয়ে উঠেন। আর এমন বিহ্যাভটা করে ফেলেন। এইখানে তার রাগ করাটা জায়েজ। ভুল তো তাদের ছিলই।”

.

রিয়ান আমার কাছে এসে আমার হাতটা ধরে বলে,

— তুমি সত্যি ঠিক আছো তো?

.

আমি কিছু না বলে শুধু মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দেই। রিয়ান তা দেখে এক স্বস্তির নিশ্বাস নেয়।

.

.

?

.

দেখতে দেখতে বিদায়ের সময় এসে পড়লো আর চোখের কোনে এসে ভীড় করলো অজস্র অশ্রু। যা কিছুক্ষণের মধ্যেই বাধ ভেঙে বন্যার স্রোতে বইতে থাকলো।

আরিশা আর রিংকিকে দেখে কে? দুইজনের যে পরিমানে কান্না। রিয়ানাকে ধরে তারা কেঁদেই চলেছে। আরিশা আর রিংকির বাবা-মার চোখেও পানি। তারা সবসময়ই রিয়ানাকে নিজের মেয়ের চোখে দেখেছে। রিয়ানার চলে যাওয়াতে তাদেরও অনেক কষ্ট হচ্ছে।

আরিশার বাবা এসে এইবার রিয়ানার হাত রিয়ানের হাতে রাখে এবং ওর হাতে তুলে দেয় আর বলে রিয়ানাকে যেন সে সবসময় আগলে রাখে। রিয়ান তাকে আশ্বস্ত করে যে সে সবসময় রিয়ানাকে আগলে রাখবে। তারপর রিয়ান ওকে নিয়ে গাড়িতে উঠে। রিয়ানা গাড়ির জানালা দিয়ে সকলকে শেষ বিদাই জানায়।

গাড়ি এইবার চলতে শুরু করে। রিয়ানা গাড়ির জানালা দিয়ে শেষবারের মত সকলকে দেখে নেয়। গাড়িটি এইবার নিজের গতি বাড়িয়ে দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটতে শুরু করে।

রিয়ানা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদেই চলেছে। তা দেখে রিয়ান রিয়ানার দুইগালে হাত রেখে বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে চোখের পানি গুলো মুছে দেয়। তারপর বলে,

.

— বলেছি না যে তোমার অশ্রু আমার দূর্বলতা। সহ্য হয় না তোমার চোখে অশ্রুগুলো। তোমার প্রত্যেকটা অশ্রু ঠিক বুকে গিয়ে লাগে। সো প্লিজ ডোন্ট ক্রায়।

.

— আমি বা কি করবো বলুন! চোখে আপনা আপনি পানি এসে পড়ছে। কেন যেন বুকের ভিতরে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। পারছি না সেটা সহ্য করতে।

.

— কষ্ট হওয়ারই কথা। এই সময়টা সকল মেয়ের জন্যই কষ্ট দায়ক হয়। নিজের আপনজনকে ছেড়ে চিরতরের জন্য ভিন্ন মানুষের মধ্যে থাকাটা সহজ কথা নয়। মনের মধ্যে আপনজনকে ছেড়ে আসার কষ্টটা অনেক। তাই আমি যাই বলি না কেন তোমার এই কষ্ট লাঘব হবে না। কিন্তু আমি চেষ্টা করবো সময় তোমার পাশে দাড়াতে। তোমার এই কষ্টে ভাগ বসাতে। এই বলে রিয়ানার চোখে দুই পাতাতে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়।

.

— আপনার মত করে কে আমায় বুঝবে বলুন? আপনি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

.

রিয়ান এইবার আমায় পাশ দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে,

— আর তুমি আমার সব। ভালবাসি প্রিয়! খুব বেশি ভালবাসি।

.

— আমিও। বলে তার কাধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে থাকি।

.

.

?

.

— অহহ হো সুইটহার্ট! আর কত কান্না করবে বলো? তুমি এমনভাবে কান্না করছো যেম কেউ মরে গিয়েছে।

.

— চুপ একদম চুপ!! সব সময় বাজে কথা। আপনি কি বুঝবেন যখন নিজের আপন কেউ পর হয়ে যায়। আরিশা নাক টানতে টানতে বলে।

.

— হ্যাঁ আমি তো আর আমার বোনকে বিয়ে দেই নি। তো কিভাবে বুঝবো?

.

— মজা নিচ্ছেন তাই না? দেইখেন আপনার উপর আল্লাহ গজব দিব। গজব!

.

— ইশশ কি মেয়েরে বাবা! নিজের স্বামীকেই এইভাবে অভিশাপ দেয়। কি যুগ আসলো রে বাবা! ইনোসেন্ট ফেশ করে।

.

— ওই ওই আপনি আমার স্বামী কিভাবে?আপনারে আমি কবে বিয়ে করেছি হ্যাঁ?? কিছুটা চেঁচিয়ে।

.

— মানে হবু স্বামী আরকি। আর এমনে হবু স্বামী আর স্বামী একই।

.

— কুচভি! ভেংচি কেটে।

.

সিয়াম এইবার নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে আরিশার কাজলে লেপ্টে যাওয়া চোখ মুছে দিয়ে থাকে। আর বলে,

.

— কান্নাতে তোমায় একদম মানায় না বুঝলা। একদম শাকচুন্নি লাগে। তাই আমার সামনে আর কখনো কান্না করবা না কেমন?

.

আরিশা এই কথা শুনে ছিটকে দূরে গিয়ে বসে বলে,

— বাজে লোক একটা। যান এইখান থেকে আপনার সাথে কথা নেই।

.

সিয়াম এইবার আরিশার আরও কাছে এসে ঘেষে বলে,

— এহহ বললেই হলো নাকি? তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাচ্ছি না। না এখন না পরে। সবসময় তোমার কাছেই থাকবো আমি। বুঝলা??

.

— কেন?

.

— ভালবাসি তাই। বলেই আরিশার নাক টেনে দেয়।

.

— হুহ!!

.

— বাই দ্যা ওয়ে আজকে কিন্তু রিয়ানের বাসর রাত।

.

— তো?

.

— তোমার আমার বিয়ের পর আমাদের বাসর রাত হবে আর আমি.. আর বলতে পারলো না আরিশা সিয়ামের মুখে হাত রেখে বলে,

.

— আপনি আসলেই অসভ্য। অসভ্য লোক একটা।

.

.

?

.

রিংকি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদেই চলেছে। আর বকবক করেই চলছে।

.

— পঁচা মেয়ে একটা। তুই গেলি তো গেলি আমাকে কাঁদিয়ে গেলি। এখন পুরো মেকাপ নষ্ট হয়ে গেল। এএএএ!! আমাকে নিশ্চয়ই পেত্নি লাগছে এখন। সব দোষ রিয়ানুর। ওই কেন গেল? না ও যেত, না আমি কান্না করতাম আর না আমার মেকাপ নষ্ট হতো। এএএ!! বাচ্চাদের মত কেঁদেই চলেছে।

তখনই একজন এসে রিংকির সামনে টিস্যুর বক্স এগিয়ে দেয় আর বলে,

.

— এই যে মিস বকবক। টেক দ্যা টিস্যু এন্ড স্টোপ ইউর বকবক প্লাস ক্রায় ওলসো।

.

— এই কে রে! পাশে তাকিয়ে দেখে ব্রিটিশ বান্দর। রিংকি ইশানকে দেখে একটা ভেংচি কাটলো।

তা দেখে ইশান বলে,

.

— হোয়াট?

.

— ওই ব্রিটিশ বান্দর চুপ! যেখানে সেখানেই ইংরেজিতে পকর পকর শুরু। আরেহ ভাই মোরা বাঙালি জাতি। একটু তো বাংলাতে কথা বলো।

.

— অহ মাই গোড। মিস বকবক তুমি কত বকবক করো? মাথাটা ধরে গেল।

.

— হুহ! তাতে আমার কি? বাই দ্যা রাস্তা আপনি কেমন মানুষ হ্যাঁ? একটা মেয়ে এইখানে কাঁদছে কই তুমি এসে তাকে থামাবে তা না তার সাথে ঝগড়া করতে লেগে পড়লে?

.

— আমি কোথায় ঝগড়া করলাম? অবাক হয়ে।

.

— এই যে এতক্ষণ করছিলে। এইটা ঝগড়া না তো কি?

.

— উফফ ইয়ার! তোমার সাথে আমি পারবো না। আচ্ছা এখন যদি তোমার বকবক শেষ হয় তাহলে কান্নাটা মুছে নাও। তোমার চোখের নিচে কালি ছড়িয়ে গিয়েছে।

.

— অহহ নো!! ওই ব্রিটিশ বান্দর তারাতারি টিস্যু দাও। এইটা না মুছলে আমি রাস্তা দিয়ে যাব কিভাবে?

.

— এই নাও? বাই দ্যা ওয়ে তোমায় কাদলে না অনেক কিউট লাগে।

.

— হুহ! আমি জানি। তাই তো এতক্ষণ কাঁদছিলাম। ভাব নিয়ে।

.

— মিথ্যুক! তুমি না রিয়ানা ভাবির জন্য কাঁদছিলে?

.

— হুহ বলছে! আমি কেন কাঁদছিলাম তা আমি বেশি জানি নাকি আপনি? নিশ্চয়ই আমি! তাহলে তর্ক করেন কেন?

.

— আমি তর্ক কোথায় করলাম? অবাক হয়ে।

.

— এই যে মুখে মুখে কথা বললা এইটাই তর্ক। আপনি এত বড় হয়ে এটাও জানেন না? সেম অন ইউ! সবাই ঠিকই বলে,” বান্দার কেয়া জানে আন্দার কি বাদ।”

.

— এক মিনিট! আমি যতটুকু জানি এইটা তো এমন না। সবাই তো বলে, ” বান্দার কেয়া জানে আদরাক কা সোয়াদ।”

.

— এইটা রিংকির নিউ ক্রিয়েশন। ইউ হ্যাভ টু বুঝতে হবে। ভাব নিয়ে।

.

— আমিও ভুলে গিয়েছিলাম তুই নরমাল কোন মানুষ না। প্লিজ কেরি অন! বাই।

.

— হুহ!

অধ্যায় 41 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!