সকাল থেকেই বাসায় তোড়জোড় লেগে আছে। রিংকি আর আরিশার বাবা মাও এসে পড়েছে। তারা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আমাকে তারা কোন অংশে নিজের মেয়ের থেকে কম ভালবাসে না। বরং একটু বেশিই ভালবাসে। তাই আমার বিয়েতে তারাই আমার রিলেটিভ হিসাবে থাকবেন। আর সব দ্বায়িত্ব পালন করবে।
কিছুক্ষণ আগেই রিয়ান আমার জন্য এংগেইজমেন্ট ড্রেস, অর্নামেন্টস, কসমেটিকস সব পাঠিয়ে দিয়েছে। রিংকি আর আরিশা,সব খুলে খুলে দেখছে। আমি খাটের এক কোনে বসে ড্রেসটার দিকে এক মনে তাকিয়ে আছি। মনের মধ্যে চলছে আমার এক ভয়ংকর ঝড়। যা আমাকে বার বার এলোমেলো করে দিচ্ছে।
কালকে রাতে মেসেজটি পড়ার সাথে সাথেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম এইটা আরিয়ানের মেসেজ। আরিয়ান কোনদিনই আমায় খুশি থাকতে দিবে না। নিজেকে সংযত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি তাও বার বার ব্যর্থ হচ্ছি। অনেক কান্না পাচ্ছে কিন্তু কান্না করছি না। কোন মতে নিজেকে সামলিয়ে রেখেছি। আমাকে যে দূর্বল হলে চলবে না। নিজেকে শক্ত করার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
আমি যখন এইসব ভাবছি তখন আরিশা আর রিংকি আমার পাশে এসে বসে। আরিশা আমার কাধে হাত রাখতেই আমি চমকে উঠি। আরিশা আমাকে কিছু ছবি দেখিয়ে বলে।
.
— দেখ দেখ!! ড. রিয়ান তোর জন্য এংগেইজমেন্ট রিং এর কিছু ছবি পাঠিয়েছে। দেখ তোর কোনটা ভালো লাগে? (আরিশা)
.
— উফফ রিং টি জোস!! আমি তো দেখেই ক্রাশ খেলাম। (রিংকি)
.
— বইন! জীবন্ত মানুষ কি কম পড়েছিল নি যে এখন তুই এই জড়বস্তুর উপরও ক্রাশ খাওয়া শুরু করেছিস। (আরিশা)
.
— সাট আপ! ইউ ফক্কিন্নি! তুই কি বুঝবি ক্রাশ খাওয়া ও একটা আর্ট। যা সবাই পারে না হুহ! (রিংকি)
.
— কচু পারে না! হুহ! (আরিশা)
.
আমি এখনো আগের ন্যায় চুপচাপ বসে আছি। তা দেখে আরিশা কিছুটা খটকা লাগে। সে বলে,
.
— রিয়ানু কি হয়েছে তোর? সকাল থেকেই দেখছি তোর মন খারাপ। মুখে না আছে কোন কথা, না আছে কোন হাসি, না আছে কোন আনন্দের ঝলক। আজ যে তোর এংগেইজমেন্ট তার জন্য তোর মধ্যে আমি কোন এক্সাইটমেন্টই দেখতে পাচ্ছি না। কি হয়েছে আমায় বল?
.
আমি এইবার নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। আরিশাকে ধরে কেঁদে দিলাম। আরিশা আর রিংকি এইবার বেকুবের মত চেয়ে থাকে। কি হচ্ছে তারা কিছুই বুঝতে পারছে না। আরিশা এইবার আমায় জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। তারপর বলে,
.
— কি হয়েছে আমার জান্টুসটার? এইভাবে কাঁদছে কেন সে?
.
আমি কাঁদতে কাঁদতে বলি,
.
— মমোবাইল.. মমেসেজ! গলা ধরে আসছিল আমার যার জন্য কথা বলতে পারছিলাম না।
.
আরিশা এইবার রিংকিকে বলে আমার ফোনটা আনতে। রিংকি আমার ফোনটা খুঁজে নিয়ে আসে। আমার ফোনে লক না থাকায় আরিশা সহজেই মোবাইল খুলে মেসেজ অপশনে চলে যায়। তারপর আরিয়ানের দেওয়া মেসেজটা পড়ে। রিংকিও সাথে পড়তে থাকে মেসেজটা। তখন আমি বলি।
.
— আরিয়ান আমায় ভালো থাকতে দিবে না রে। ও আমায় এইবার আমার সকল খুশি কেড়েই নিবে। ধ্বংস করে দিবে আমায়।
.
আরিশা এইবার আমার দুই গালে হাত রেখে বলে।
— তুই এইবার আমায় বল, তুই কেন ভয় পাচ্ছিস? তুই কোন খারাপ কাজ করেছিস? (আরিশা)
.
আমি মাথা দুলিয়ে “না” সূচক উত্তর দেই।
.
— ওই ঘটনাতে তোর কোন দোষ ছিল? বা তুই কি নিজ ইচ্ছায় জড়িত ছিলি? (আরিশা)
.
আমি আবার মাথা দুলিয়ে “না” সূচক উত্তর দেই।
.
— তুই কি কোন ভুল বা অন্যায় করেছিস? আরিয়ানের সাথে কি তোর কোন সম্পর্ক ছিল?(আরিশা)
.
— না।
.
— তাহলে তুই কেন ভয় পাচ্ছিস? যা করেছে সব আরিয়ান করেছে। ভয় পেতে হলে ওকে পেতে হবে। তুই কেন ভয় পাচ্ছিস? তোর এইখানে কোন দোষ নাই রে। কেন তুই ওর সামনে নিজেকে দূর্বল করছিস? কেন ওকে তুই নিজের উপর জোর চালানোর সুযোগ দিচ্ছিস? (আরিশা)
.
— আমি কি করবো বল? ওর কথা মনে করলেই আমার সেই দিনের কথা মনে পড়ে যায়৷ যার জন্য ওকে দেখলেই আমায় ভয় করে। জানি ও আমার কিছু করতে পারবে না কিন্তু তাও। বার বার আমার সেই কালো অতীতটাই মনে পড়ে। তখন নিজেকে সামলিয়ে রাখা দায় স্বরুপ হয়ে উঠে। বিশ্বাসঘাকতা এত সহজে ভুলা যায় না। ও আমাকে পুরো পুরি ভাবে ভেঙে দিয়েছিল যা আমি জোরা ঠিকই লাগিয়ে নিয়েছিলাম কিন্তু দাগটা এখনো রয়েই গিয়েছে।
.
— আমি জানি! কোন মেয়ের পক্ষেই এইসব ভুলা সম্ভব না। কিন্তু তাও তুই পেরেছিলি। সব ভুলে মুভ অন করতে পেরেছিলি তুই। আর এর জন্য আমরা গর্বিত। (আরিশা)
.
— দেখ ভয় পেয়ে লাভ নেই। যা হবার হবেই। তুই যখন কোন ভুল করিস নি তখন ভয় কেন পাবি? এইবার ভয় ও আমাদের পাবে। আগের বার যে শাস্তি অর্ধেক রয়ে গিয়েছিল এইবার তা সে পূর্ণ রুপে পাবে। এইবার আমি ওকে কাছে পেলে ওর ছোট ছোট টুকরা করে তার কিমা করে আমার ইন্দুরদের খাওয়াবো। (রিংকি)
.
— আর আমি ওকে ব্ল্যান্ডারে জুস করে তার মধ্যে আদা, রসুন, মরিচ, তেলাপোকা শিং, মশা মগজ, হাতির নখ, হরিনের দাঁত, এনাকোন্ডার ডিম দিয়ে গন্ডারদের খাওয়াবো। ( আরিশা)
.
( কেউ কি এই ড্রিংক টেস্ট করতে চান??)
.
আমি এইবার না হেসে পারলাম না। আমার হাসি দেখে দুইজনে এইবার হেসে দেয়। আর দুই পাশ থেকে দুইজনেই জড়িয়ে ধরে। আর বলে,
.
— এইভাবেই সবসময় হাসতে থাকবি কেমন?
.
.
??
.
রিয়ান সকাল থেকেই দৌড়ের উপরে। বাসায় বেশ কিছু মেহমানও এসে পড়েছে। তাদের আপায়নে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে সে।
মেহমান বলতে, রিয়ানের দিদা, রিয়ানের ছোট ফুপু সাথে তার জামাই আর দুই মেয়ে, রিয়ানের দুই খালা তার সাথে তাদের জামাই আর তাদের চার ছেলে মেয়ে।
.
.
[[ পরিচয় পর্বঃ
ছোট ফুপুর নাম রাহেলা আর তার দুই মেয়ের নাম নিলা আর রিনা। জমজ দুইজন। দুইজনেই রিয়ানের বেশ ছোট। সবে মাত্র এইবার এইচএসসি দিবে।
বড় খালার নাম হিনা। তার ঘরে একটা মাত্র ছেলে সন্তান। ছেলের নাম শুভ। একটা প্রাইভেট কোম্পানি জব করে। বিয়ে করেছে আর তার একটা মেয়েও আছে। নাম রাইশা।
ছোট খালার নাম নাসরিন। তার ঘরে দুই ছেলে এক মেয়ে। এক ছেলের নাম হিমেল। এইবার অনার্ষের ৩য় বর্ষে পড়ে। অন্য ছেলের নাম সিয়াম। অনার্ষের ১ম বর্ষে ছাত্র। মেয়ের নাম মাইশা। এইবার এসএসসি দিবে। ]]
.
.
রিয়ান সকলকে তাদের ঘর দেখিয়ে দিয়ে তাদের রুমে নাস্তা পাঠিয়ে দেয়। ছোটরা সব এক রুমে আর বড়রা অন্য রুমে। দিদার জন্য আলাদা রুম দেওয়া হয়েছে। আর বড় খালার ছেলে শুভ আর তার বউ বাচ্চার জন্য আলাদা একটা রুম।
এত মানুষ হবে বলে রিয়ান আগে থেকেই দুইজন সার্ভেন্টকে ঠিক করে রেখেছিল।
রিয়ান এইবার ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে। তারপর একটা দীর্ঘ শ্বাস নেয়। পকেট থেকে ফোন বের করে সিসিটিভি ফুটেজটা অন করে দেখার জন্য তার রিয়ুপাখি কি করছে!
সিসিটিভি অন হতেই রিয়ানার হাসউজ্জ্বল মুখ ভেসে উঠে৷ সে আরিশার আর রিংকি এর সাথে হেসে হেসে কথা বলছে আর সব কিছু দেখছে। এইটা দেখে রিয়ান স্বস্তির নিশ্বাস নেয়। তারপর মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,
.
— “❤রিয়ুপাখি, তোমার হাসি
সহস্র মেঘের শুভ্রতা নিয়ে ছুঁয়ে যায় আমার হৃদয়,
ছুঁয়ে যায় আমার স্বপ্নগুলো,
ছুঁয়ে যায় আমার পাগল মনটা কে।
আমি দিশেহারা হয়ে তোমার প্রণয় সমুদ্রে
হারিয়ে নিজেকে খুঁজে পাই পৃথিবীর নতুন বিস্ময় ,
ভালোবাসি তোমায়। ❤”
.
.
এই বলে মোবাইল স্ক্রিনে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে। তখন নিলা ( ছোট ফুপুর মেয়ে) এসে বলে,
— ভাইয়া আপনাকে দিদা ডাকছে। (নিলা)
.
রিয়ান কথাটা শুনে দাড়িয়ে পড়ে আর নিজের পকেটে মোবাইল ভরতে ভরতে বলে,
.
— তুমি যাও আমি আসছি। এই বলে হাটা ধরে।
.
.
রিয়ানের আর জানা হলো না এই হাসি মুখের পিছে লুকিয়ে থাকা কষ্ট আর যন্ত্রণাটা।
.
.
??
.
সকল জিনিস গুলোতে হাত বুলিয়ে দেখছি। দেখেই বুঝা যাচ্ছে একেকটা জিনিস খুব যত্নসহ কারে প্যাক করা হয়েছে। সব কিছুই আমার পছন্দের। আমি মুগ্ধ হয়ে সব দেখছি।
ঠিক তখন আরিশা বলে উঠে।
— রিয়ু প্রমিস কর তুই এখন থেকে আর ভয় পাবি না। যত যাই হোক। আরিয়ান সামনে এসে পড়লেও তুই নিজেকে দূর্বল হতে দিবি না। (আরিশা)
.
— ওকে প্রমিস। আমি নিজেকে ওর সামনে দূর্বল হতে দিব না।
.
— আর হ্যাঁ আজকেই ড. রিয়ানকে সব বলে দিবি। (রিংকি)
.
— হ্যাঁ আমিও ভেবেছি। আজ এংগেইজমেন্টের পর সব জানিয়ে দিব তাকে।
.
— দ্যাট ইজ লাইক এ গুড গার্ল। এখন রিং চুজ কর। ড. রিয়ানকে দিতে হবে তো। (আরিশা)
.
— আর কত ড. রিয়ান বলবি? এখন তো তিনি তোদের দুলাভাই। তো ভাইয়া বলতে শিখ।
দুইজনের মাথায় এক বারি মেরে।
.
— কি করুম অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। বদলাতে একটু টাইম লাগবে। (আরিশা)
.
— কেয়া কারু ও লেডিস মেহু আদাত সে মাজবুর। দাঁত কেলিয়ে। (রিংকি)
.
— হাইরে রিংকি রেএএ, সত্যি তুই স্টার জলসার দোকান। (আরিশা)
.
— আই নো বেবি। ভাব নিয়ে। (রিংকি)
.
এই বলে তিন জনেই হেসে উঠি। তখন দরজায় নক পড়াতে আমরা তিনজনে সেইদিকে তাকাই। আর যাকে দেখি তাতে তিনজনই শোকড হয়ে যাই। নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম যে আদো এইটা সত্যি কি না! হুট করেই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো আমার।