সোফার মধ্যে বসে আছি। পাশেই রিয়ানের দীদা বসা। অন্যপাশে রিয়ানের ছোট ফুপু। সামনে বসে আছে রিয়ানের বড় আর ছোট খালা। নিলা,রিনা,মাইশা মিলে রিয়ানের রুম সাজাচ্ছে। দোলন ভাবি এক কিনারে বসে রাইশাকে খাওয়াচ্ছে। ছাদের রিয়ান, শুভ ভাইয়া, হিমেল, জ্যাক, ইশান, সিয়াম (ছোট খালার ছেলে) মিলে আড্ডা দিচ্ছে।
দীদা আমার থুতনিটা টেনে বলে,
.
— মাশাল্লাহ! তোর থেকে আজ চোখই সরানো যাচ্ছে না৷ কাউরো নজর না লাগুক। এই বলে আমার নজর তেরে দেন। তারপর মুচকি হেসে বলে,
.
— বুঝলি রাহেলা (ছোট ফুপু) আমার নাতী এমনে এমনেই আমার নাতবৌ এর জন্য পাগল না। কিছু তো আছে ওর মধ্যে।
.
দীদার কথা শুনে আমি লজ্জায় লাল হয়ে যাই। দীদা এইবার নিজের ব্যাগ থেকে দুটি চিকন সোনার চুড়ি বের করলেন। তারমধ্যে হাল্কা সরুকাজ করা। দীদা আমার হাতটা টেনে ধরে চুড়িটা পড়িয়ে দিতে দিতে বলে,
.
— এইটা আমি আমার নাতবৌ এর অনেক আগে থেকে বানিয়ে রেখেছিলাম বুঝলি। আজ যেহেতু আমার নাতবৌকে আমি পেয়ে গিয়েছি তাই আজ আমি তোকে দিয়ে দিচ্ছি। এইটা কখনো নিজের হাত থেকে খুলবি না কেমন।
.
— আচ্ছা দীদা।
.
— সবসময়ই এইভাবে হাসি খুশি থাক। এখন যাও রুমে গিয়ে একটু বিশ্রাম নাও। রিনা, নিলা এইদিকে আয় তো। তোদের ভাবিকে নিয়ে রুমে যা।
.
.
তখনই হুর হুর করে নিলা, রিনা আর মাইশা সোফার রুমে এসে হাজির হলো। তারপর আমার সামনে এসে বলে,
.
নিলাঃ ভাবি চল তোমায় নিয়ে যাই। রুম কেমন সাজিয়েছি তা দেখবে না?
.
মাইশাঃ হ্যাঁ ভাবি তারাতারি চল। তুমি আবার আগে রুমে না গেলে তো আমাদের ভাইয়া রুমে আসবে না। দুষ্টু হাসি দিয়ে।
.
রিনাঃ উফফ তোরাও না কি শুরু করেছিস এইসব? ভাবি তুমি আসো তো। রেস্ট নিয়ে নাও একটু।
.
.
আমি কিছু না বলে মুচকি হেসে তাদের সাথে রুমের দিকে অগ্রসর হই।
.
.
?
.
বিছানার এক কিনারে বসে আছি। কিছুক্ষণ আগেই রিনা, নিলা ও মাইশা মিলে আমায় রুমে বসিয়ে দিতে গিয়েছে। ওরা বেশ কিছুক্ষণ ছিল। আমার সাথে দুষ্টুমি করছিল। পরে দীদার ডাক পড়তেই সকলে দৌড়ে পালায়। অতঃপর আমি চোখ বুলিয়ে চারপাশটা দেখতে থাকি।
চারদিকটা কাঠগোলাপের ঘ্রাণে মো মো করছে। তার সাথে নাকে এসে বারি খাচ্ছে রক্তগোলাপের মিষ্টি গন্ধ৷
বিছানার চারপাশটাতে কাঠগোলাপ দিয়ে সাজানো। বিছানার মাঝে লাল গোলাপের নরম পাপড়ি দিয়ে হার্ট সেপ করা। ড্রেসিংটেবিল ও মেঝেতেও লাল গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো। বেশ লাগছে সব কিছু।
আমি চুপচাপ বসে আছি। তখনই দরজা খুলার আওয়াজ আসে। আমি চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি রিয়ান। রিয়ান দরজা বন্ধ করে সামনে আসে। আমি এইবার দাড়িয়ে যাই তারপর তার সামনে গিয়ে সালাম করতে নেই। আমাকে নিচু হতে দেখেই রিয়ান আমার বাহু দুটো ধরে থামিয়ো দেয় তারপর আমাকে তার বুকের সাথে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলে,
.
— রিয়ুপাখি তোমার জায়গা আমায় পায়ে না আমার হৃদয়ে। তুমি আমার এই অসীম হৃদয়কে রেখে পায়ে কেন যেতে চাচ্ছো হ্যাঁ?
.
আমি এইবার ধীর কন্ঠে বলি,
— নিয়ম বলে তাই।
.
— এত নিয়ম তোমায় মানতে হবে না বুঝলে। এইসব নিয়ম অন্যের জন্য হবে কিন্তু আমার রিয়ুপাখির জন্য না। এখন যাও ফ্রেশ হয়ে ওযু করে আসো। নফল নামাজটা সেরে নেই। আমাকে ছেড়ে দিয়ে।
.
— আচ্ছা। মুচকি হেসে।
.
আমি লাগেজটা থেকে একটা লাল রঙের সুতি কামিজ নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াই।
.
.
?
.
নামাজ পড়ে উঠতেই রিয়ান বাইরে গিয়ে দুই কাপ কফি নিয়ে আসে। আর আমার হাতে এক কাপ কফি দিয়ে বলে,
.
— আজ সারাদিন অনেক ধকল গিয়েছে তোমার উপর দিয়ে তাই নাও গরম গরম কফি। ইউ উইল ফিল বেটার।
.
আমি তখন মুগ্ধ নয়নে রিয়ানের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। একটা মানুষ ঠিক কতটা ভালবাসতে পারলে এতটা কেয়ার করতে পারে তা রিয়ানকে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না। যে ভালবাসাকে আমি একসময় অবজ্ঞা করতাম আজ আমিই এই ভালবাসার মায়াজালে আবদ্ধ। কখনো ভাবতেও পারি নি যে আমাকে কেউ ঠিক এতটা ভালবাসবে।
রিয়ান আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
.
— চল বারান্দায় গিয়ে দাড়াই।
.
আমিও ত সম্মতি জানিয়ে তার পিছে পিছে বারান্দায় যাই। এক হাতে কফি নিয়ে বারান্দার এক পাশে আমি আর রিয়ান দাড়িয়ে আছি। বাইরে হাল্কা বাতাস বইছে। আকাশটা আজ পরিষ্কার। খানিকটা স্বচ্ছ পানির মত। তার মধ্যে পিটিপিটি করে জ্বলে উঠছে অসংখ্য ঝিকিমিকি তারা। কিন্তু আজ এই আকাশটা পুরিপূর্ণ না। কেন না রাত আকাশের আসল সৌন্দর্য চাঁদ মামাটাই আজ নিখোঁজ।
আমি আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। হাল্কা বাতাসে চুল গুলো দোল খাচ্ছে। চুল ভিজা বলে নিচ দিয়ে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। আমি রিয়ানের দিকে না তাকিয়ে বলি,
.
— আজকে আকাশে চাঁদ থাকলে কতটাই না ভালো হতো। সব কিছুই একদম পুরিপূর্ণ হতো। তাই না?
.
— আমার চাঁদ তো আমার সামনেই।
.
কথাটা শুনার সাথে সাথে আমি রিয়ানের দিকে তাকাই। দেখি তিনি পাশের রেলিং এ পিঠ ঠেকিয়ে দাড়িয়ে আছে আর ঘোর লাগা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে মধ্যে কফির কাপটিতে চুমুক দিচ্ছে। আমি রিয়ানের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেই। কেন যেন আজ তার দিকে তাকাতে ভীষণ লজ্জা করছে। আমি কিছু না বলে চুপ করেই থাকি।
রিয়ান তার কফির মগটা রেলিং এর উপর রেখে উপরের দড়ি থেকে তোয়েলা নিয়ে আমার কাছে আসে। তারপর আমায় ধরে একটা মিনি চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে আমার চুল মুছে দিতে শুরু করে। আর বলতে থাকে,
.
— নিজের প্রতি তোমার একটুও খেয়াল নেই তাই না। দেখো চুল দিয়ে কিভাবে পানি পড়ছে! একে তো এত রাতে শাওয়ার নিয়েছো তার উপর চুলটাও ঠিক মত মুছো নি। ঠান্ডা লাগলে কি করতে?
.
এইবার আমি নিজেকে স্বাভাবিক করে নেই। তারপর বলি,
— আপনার সেবা উপভোগ করতাম। দুষ্টুমির সুরে।
.
— অহহ আচ্ছা এই ধান্দা তাই না! তা মেডাম আমি কি সব জায়গায় সেবা করে যাব নাকি? বাইরে রোগীদের সেবা আর বাসায় বউয়ের সেবা।
.
— বউয়ের সেবা করা স্বামীর কর্তব্য। বুঝলেম মি. সাদাত খান রিয়ান ওরফে মি. খারুস।
.
— সবই বুঝলাম কিন্তু এখন এই খারুস নামটা কোথা থেকে উদোয় হলো?
.
— বহুত আগে থেকেই। শুধু মাঝে একটু বেরাতে গিয়েছিল। এখন আবার এসে পড়েছে।
.
— ইউ আর জাস্ট ইম্পসিবল।
.
— হেহে!
.
— এই নাও তোমার চুল মুছা হয়ে গিয়েছে। এখন কফিটা শেষ করে ঘুমাতে চল। অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। তোমার এখন রেস্ট নেয়া উচিৎ।
.
আমি কিছু না বলে রিয়ানকে জড়িয়ে ধরি আর বলি,
— জানেন রিয়ান আমি না সত্যি অনেক ভাগ্যবতী যে আমি আপনার মত একজন জীবনসঙ্গীকে পেয়েছি। যে নাকি নিজের আগে আমার কথা ভাবে। আমাকে নিয়েই তার যত চিন্তা ভাবনা। আপনার মত করে না ভালবাসতে পারলেও আপনার থেকে কম ভালবাসি না আপনায়। ভালবাসি মি. খারুস আপনাকে।
.
রিয়ান এইবার আমার কপালে ভালবাসার এক ছোঁয়া দিয়ে আমায় আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলে,
— তুমি আমার ভালবাসা নয় আমার আসক্তি। যা আমি কখনোই ছাড়তে পারবো না। ভালবাসা ছাড়া যায় কিন্তু আসক্তি না। তাই তো আমার আসক্তি যে তুমি। মুখে তৃপ্তির হাসি হেসে।
.
.
?
.
রাত ৩ টা বেজে ২৯ মিনিট,
রিয়ানের ফোনটা ক্রিং ক্রিং করে বেজে চলেছে। রিয়ান আদো আদো চোখে মোবাইলটা হাতে নেয়। মোবাইলটা হাতে নিতেই চোখের সামনে একটি প্রাইভেট নাম্বার ভেসে উঠে। রিয়ান এইবার কলটি কেটে গিয়ে একবার রিয়ানার দিকে তাকায়। রিয়ানা ঘাপটি মেরে রিয়ানের বুকে মুখ গুজে শুয়ে আছে। শীতে খানিকটা কুকড়িয়ে আছে। ঠোঁট দুটো উল্টানো। ফেরি লাইটের আলোয় রিয়ানা মুখটা একদম নিষ্পাপ বাচ্চার মত লাগছে। রিয়ান এইবার রিয়ানার দিকে একটু ঝুঁকে ওর কপালে এক ভালবাসার স্পর্শ একে ওকে খুব আলতো ভাবে পাশের বালিশে শুয়ে দেয়। আর ওর গায়ে একটি চাদর জড়িয়ে দেয়। রিয়ানা গরম উষ্ণতা পেয়ে চাদরটি ভালো মত আঁকড়ে ধরে।
রিয়ান এইবার মোবাইলটি নিয়ে বারান্দায় চলে যায়। তারপর সেই নাম্বারে আবার ফোন দেয়। তারপর গম্ভীর গলায় বলে উঠে,
.
— এনি নিউজ?
.
_______________________________________________________________
.
— ফাইন্ড হিম এস সুন এস পসিবেল। গোট ইট। হিংস্র হয়ে।
.
রিয়ান জিদে ফোন কেটে দেয়। তারপর রাগে ফুসতে ফুসতে বলে,
.
— তুই যেই হোস না কেন তোকে তো আমি খুঁজে বের করবোই। আমার কলিজায় হাত দেওয়ার মত দুঃসাহস করিছিস তুই। তোর তো আমি যে অবস্থা করবো তা তুই স্বপ্নেও ভাবতে পারবি না। ইউ হ্যাভ টু পে ফোর দিস।
.
— রিয়ান!!