সকালে আরিশা আর রিংকির চেঁচামেচিতে ঘুমটা ভেঙে যায়। পিটি করে চোখ খুলি আর আবছা চোখে তাদের দিকে তাকাই। কোন কিছু স্পষ্ট দেখতে না পেড়ে চোখ দুটো কচলিয়ে, আরমোড় ভেঙে বিছানা থেকে উঠে এইবার ভালো মত ওদের দিকে তাকিয়ে। তাকিয়ে যা দেখি তাতে আমি হা হয়ে থাকি।
আরিশা আর রিংকির দুইহাতেই দুটি থাল, তার মধ্যে পাউডার রঙ (গুলাল)। আর ওদের মুখের মধ্যে দুষ্টু হাসি।
আমি এইবার তাদের দিকে বিষ্ময়কর চোখে তাকিয়ে থাকি তা দেখে আরিশা বলে,
.
— কি গো মনু এমনে চাহিয়া চাহিয়া কি দেখো? (আরিশা)
.
— তোরা রঙ নিয়ে দাড়িয়ে আছিস কেন?
.
— কেন মনু তুমি জানো না? (রিংকি)
.
— না।
.
— আজকে রঙ খেলার অনুষ্ঠান। আজকে ইচ্ছা মত রঙ দিয়ে খেলবো। দাঁত কেলিয়ে। (আরিশা)
.
— তোকে যদি আজ মেরে থুরি রং দিয়ে রাঙ্গিয়ে ভূত না করেছি তাহলে আমার নামও রিংকি না। (রিংকি)
.
— তবে রেএএএ।
এই বলে বিছানা ছেড়ে রিংকির দিকে তেড়ে যাই। রিংকি ভয়ে দে দৌড়। আমি আর রিংকি পুরো ঘর দৌড়াতে থাকি আর পিছে আরিশা চেঁচাতে থাকে।
.
.
?
.
সাদা শাড়ি গায়ে জরিয়ে মুখে হাল্কা মেকাপ করেছি। চুল গুলো সামনে এনে সাইড দিয়ে খোঁপা করেছি। হাতে সাদা রঙের রেশমি চুড়ি। আমাদের বাসার ছাদেই নাকি রঙ খেলা হবে। তাই আরিশা আর রিংকি আমার ছাদে নিয়ে যায়। ছাদে গিয়ে দেখি নিলা, হিমেল , রিনা, সিয়াম, মাইশা, জ্যাক, শুভ ভাইয়া,দোলন ভাবি, ড. সিয়াম, ইশান সকলেই এসেছে। সকলেই আজ সাদা রঙে রাঙ্গিত। দেখে মনে হচ্ছে যে স্বচ্ছ আকাশের মেঘগুচ্ছ গুলো এসে ভীড় করেছে এইখানে।
আমি সকলকে দেখে কিছুটা অবাকই হই। তাদেরকে আমি এইখানে আশা করি নি। আরিশা আর রিংকি আমায় সকলের মাঝে নিয়ে যায়। আমি সকলের সাথে কুশল বিনিময় করে চারদিকে চোখ বুলাতে থাকি। চোখ জোড়া বার বার রিয়ানকে খুঁজে চলেছে। এক ঝলক তাকে দেখবার জন্য।
তখনই নিলা আমার কাছে এসে বলে,
.
— ভাবি আপনার দুই নয়ন যাকে খুঁজিতে সে ওইখানে। ডান দিকে ইশারা করে।
.
আমি ওই দিকে তাকিয়ে দেখি রিয়ান ফোনে কথা বলতে বলতে আসছে। পড়নে তার সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা চুড়িদার৷ বুকের বা পাশে সাদা সুতোর সরুকাজ করা। তারপর মধ্যে হাল্কা পাথর বসানো। চুল গুলো সামনে এসে কপালে বারি খাচ্ছে। মুখে সেই মন ভুলানো হাসি। আমি তার দিকে একনজর তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে বলি,
.
— আমি তো তাকে খুঁজছিলাম না। আমি তো আসলে..
.
— থাক থাক আর বলতে হবে না, আপনি না বললেও কিন্তু আমরা সবই বুঝি। কুছ কুছ হোতা হে! তাই না। বলে নিলা হেসে উঠে।
.
— যাহ! লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছিল আমার তাই সেখান থেকে সরে আসি আমি।
.
.
এক কিনারে দাড়িয়ে ছাদের ডেকোরেশনটা দেখছি। চারদিকে চারটি বাঁশ লাগিয়ে উপর দিয়ে বিভিন্ন রঙের নেট কাপড় গুলো মাঝ বরাবর নিয়ে এসে একত্রিত করে প্যান্ডেলের মত করা হয়েছে। তার মধ্যেই ঝুলছে ভিন্ন ভিন্ন রঙের জড়ি। দেখতে বেশ শোভনীয় লাগছে।
আমি এইসব দেখছি তখন রিয়ান আমার পাশে এসে দাড়ায় তারপর বলে,
.
— এত মনোযোগ দিয়ে কি ভাবছো?
.
আমি তার কথায় চমকে পাশে তাকাই তারপর তাকে দেখে কিছুটা স্বাভাবিক হই। তারপর ধীর কণ্ঠে বলি,
.
— ভাবছি কালকে আমার জীবন পুরোপুরি বদলে যাবে। কালকে আমি মিস থেকে মিসেস হয়ে যাবো। নিজের একাকিত্ব জীবন পেড়িয়ে সাংসারিক জীবনে পা রাখবো। নিজেকে অন্যের কাছে সারাজীবনের জন্য বিলীন করে দিব। আনমনে।
.
— প্রথমত্ব তুমি অনেক আগেই মিসেস খান হয়ে গিয়েছো। কালকে তুমি সকলের দৃষ্টিকোনের জন্য দ্বিতীয়বারের মত আবার মিসেস খান হবে। আর রইলো সাংসারিক জীবনের কথা, তা সকল মেয়েকেই এক না এক সময় করতে হয়। এই সময়টা সকলের মেয়ের জীবনেই আসে তাই এত ভেবে কাজ নেই।
আর একটা কথা বুঝে নিও, তোমাকে আমি কোন কিছুর জন্য বাঁধা দিব না কিন্তু যে জিনিসটা আমার অপছন্দ তা কখনো করিও না। যাকে যে অধিকার দেওয়ার দিও কিন্তু ভালবাসারটা দিও না। কেন না তোমাকে ভালবাসার অধিকারটা শুধুই আমার। আর সেটা আমারই থাকবে।
আর রইলো নিজেকে বিলীন করার, তোমাকে ভালবেসেছি এই শর্তে নয় যে কিছু পাবো বলে। আমার ভালবাসা নিরস্বার্থ। একদম স্বচ্ছ পানির মত। শুধু এতটুকুই চাই তোমার মনের এক কোনে শুধু আমি থাকতে।
.
রিয়ানের কথায় চোখটা ছলছল হয়ে আসে। আমি কোন মতে নিজেকে সামলিয়ে বলি,
.
— আমার পুরো মন, হৃদয়টা জুড়ে শুধুই আপনি আছেন। আমিটা জুড়েই শুধু আপনি আর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শুধু আপনি এই থাকবে।
.
রিয়ান মুচকি হেসে পাশ থেকে রঙের থাল থেকে লাল রঙ নিয়ে আমার গালে ছুঁয়ে দেয় তারপর বলে,
.
— নাও আজ তোমায় নিজের ভালবাসার রঙে রাঙ্গিত করে দিলাম।
.
আমিও রঙ নিয়ে তার গালে ছুঁয়ে দেই। আর মুচকি হেসে অন্যদিকে চলে যাই।
.
.
?
.
— ওই মি. ব্রিটিশ বান্দর। লুক এট মাই খুম্মা।
.
— ওয়েট হোয়াট ডিড ইউ স.. এই বলে পাশে ঘুরতে নিবে তার আগেই রিংকি থালে থাকা লাল রঙগুলো ইশানের মুখের উপরে ছুঁড়ে মারে।
তারপর হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে খেতে থাকে৷ কোন মতে নিজের হাসিটা থামিয়ে বলে,
.
— নাও ইউ আর লুকিং লাইক খাটি বাংলাদেশি লাল বান্দর। আহা! আজ একদম দেশি দেশি ফিলিং আসতেছে। বলে আবার হাসিতে মেতে উঠে।
.
— ইউউউউ মিস বকবক! হোয়াট হ্যাভ ইউ ডান! রাগে ফুসতে ফুসতে।
.
— যা করেছি অনেক ভালো একটা কাজ করেছি। ব্রিটিশ বান্দরকে বাংলাদেশি বান্দরে রুপান্তরিত করেছি। আমাকে নোবেল না না ওস্কার দেওয়া উচিৎ। ভাব নিয়ে।
.
— ওস্কার মাই ফুট!
.
— বাই দ্যা রাস্তা আপনাকে না পুরো “লালে লাল শাহাজালাল” লাগছে।
.
— আমাকে নিয়ে মজা করা তাই না? দাড়াও দেখাচ্ছি মজা!
.
এই বলে রিংকি দেয় দৌড় আর ইশানও হাতে রঙ নিয়ে তার পিছে ছুটে।
.
.
?
.
— এইটা কি করলেন? এইভাবে কেউ রঙে কাউকে মাখায়?
.
— আমি মাখাই। বুঝাতে হবে না যে তোমায় আমি ঠিক কতটা ভালবাসি?
.
— অহহ তাই না? তা ডক্টর থেকে কবে এই ভালবাসা দেখানোর কাজে জয়েন করেছেন শুনি?
.
— যবে থেকে তোমায় ভালবাসতে শুরু করেছি। আরেহ আগে থেকে বুঝাতে হবে না যে বিয়ের পর আমি ঠিক কতটা ভালবাসবো৷ অবশ্য বিয়ের পর কিন্তু একটু বেশি এই ভালবাসবো। দুষ্টু হাসি দিয়ে।
.
— আপনি আসলেই একজন অসভ্য লোক।
.
— শুধু তোমার জন্য! চোখ টিপ দিয়ে।
.
— দাড়ান দেখাচ্ছি মজা।
.
এই বলে আরিশা দুই মুঠো রঙ নিয়ে সিয়ামের মুখে মাখিয়ে দেয় তারপর তাকে ভেঙ্গিয়ে দৌড়ে পালায়।
.
.
?
.
সকলেই রঙ খেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রঙের আসর যেন ছড়িয়ে পড়েছে সাথে রঙের গোধূলি। সকলের মুখেই স্নিগ্ধ হাসি। রঙ নিয়ে একেক জন ছুটে চলেছে একেকজনের পিছে। আমার সাদাটা এখন বিভিন্ন রঙে পরিপূর্ণ। আপাদমস্তক আমি রঙের আবরণে ঘেরা। বাহ্যিক এমন কোন অংশ নেই যে এই রঙ তুলির ছোঁয়া পাই নি।
সকলের সাথে রঙের খেলাতে মেতেই উঠেছিলাম তখনই কেউ এসে আমার মুখে রঙ ছিটিয়ে চলে যায়। হুট করে এমন হওয়াতে আমি অপ্রস্তুত হয়ে যাই যার ফলে রঙের কিছুটা অংশ আমার চোখে চলে যায়। রঙ যাওয়ার সাথে সাথে চোখ প্রচন্ড রকম জ্বালা শুরু করে। আমি দ্রুত পানির সন্ধান করতে থাকি। সকলে রঙ খেলায় ব্যস্ত হওয়ার কারনে কাউরো নজর আমার উপর ঠিক ততোটা পড়ছে না। আমি অনেক কষ্টে ছাদ থেকে বেড়িয়ে এসে সিড়ির দিকে পা বাড়াই। তখন হাল্কা পিটিপিটি চোখে সিড়ির শেষ প্রান্তে রিয়ানকে দেখতে পাই। যে ফোনে কথা বলছে। আমি এইবার রিয়ানকে ডাক দেই।
.
— রিয়ান!!
.
আমার ডাকটা তার কানে পৌঁছাতেই সে ঘুরে দাড়ায়। আমাকে দেখে সে ফোনে “পরে কথা বলবে জানিয়ে কেটে দেয়। আমি ধীর পায়ে রেলিং ধরে তারদিকে আসতে থাকি। ঠিক তখনই আমার পাটা স্লিপ কেটে যায় আর রেলিং থেকে হাতটা ছুটে যায় আর আমি পড়ে যেতে নেই। ঠিক তখনই রিয়ান এসে আমায় সামলে নেয়। যেহেতু রিয়ান আমায় দেখছিল তাই আমায় স্লিপ খেতে দেখে দ্রুত পায়ে আমার কাছে চলে আসে আর আমায় সামলে নেয়।
আমি তখনও চোখের জ্বালায় ছটফট করছি। তাই রিয়ান দ্রুত আমায় নিচে নিয়ে যায় মুখ ধুঁয়ার জন্য।
.
রিয়ানের আর এইটি নজরে পড়া হলো না যে সিড়ির ও রেলিং এর গায়ে তেল ছড়িয়ে আছে। যার জন্যই রিয়ানা আজ পরে যেতে নিয়েছিল। হয়তো যদি আজ রিয়ান না থাকতো তাহলে হয়তো বা আজ রিয়ানা মৃত্যুর মুখে থাকতো।