আমি এইবার মুখ তুলে রিয়ানের দিকে তাকাই। রিয়ানের মুখটা একদম মলিন হয়ে আছে। চোখ মুখে ক্লান্তির ছাপ। আমি এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলি।
.
— I want divorce!!
.
কথাটা শুনে রিয়ান একটা বড়সড় ধাক্কা খায়। সে অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে এক না বলা কষ্ট উঁকি মারচ্ছে বার বার। রিয়ান নিজেকে কিছু সংযত রেখে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
.
— এএএই সসব ককি বলছো তুমি রিয়ুপাখি!! তোমার মাথা ঠিক আছে তো!! তুমি আমার থেকে কেন ডিভোর্স চাচ্ছো??
.
আমি এই ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলি,
— তো কি বলবো আর!! বলুন!! যে সম্পর্ক আমাদের মর্জিতে না বরং জোরাজোরিতে স্থাপিত হয়েছে তা কিভাবে রাখবো আমি!! আমাদের এই সম্পর্কে কোন টান নেই, ভালবাসা নেই, কোন অনুভূতি নেই, কোন দায়বদ্ধতাও নেই। বলুন আছে কি??
যে সম্পর্কের কোন ভিত্তি নেই সে সম্পর্ক রাখার কোন মানে হয় না। আর এমনেও না আপনি আমায় ভালবাসেন নননা আআআমি!! শেষের কথাটা বলতে গিয়ে আমার গলাটা ধরে আসছিল।
.
রিয়ান সব কথা শান্ত মাথায় শুনলেও শেষের কথাটা শুনে রিয়ানের মাথায় আগুন লেগে যায়। সে রাগকে কিছুটা সংযত রেখে বলে,
.
— তুমি আমায় ভালবাসো না?? দাঁত কটমট করতে করতে।
.
— নননননা!! So now I want divorcee. কাঁপা কাঁপা গলায়।
.
এই কথাটা যেন রিয়ানের রাগ শত গুন বাড়িয়ে দেয়। সে হুট করেই দাড়িয়ে যায় আর পাশে থাকা টিনের গ্লাসটা ছুঁড়ে মারে। সাথে সাথে কেমন টিং টাং শব্দ হয়ে উঠে।
আমি শব্দ পেয়ে দাড়িয়ে যাই আর কাঁপতে শুরু করি। রিয়ানের এমন রাগ আমি আগে কখনো দেখে নি। রিয়ানের চোখ দুটো একদম লাল হয়ে আছে।
আমি কাঁপা কাঁপা গলায় কিছু বলতে যাব তার আগেই রিয়ান আমার খুব কাছে চলে আসে। আমি চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। গলা দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না আমার। সে আমার গালে হাত রেখে হুট করেই আমার ঠোঁট তার ঠোঁট দ্বারা চেপে ধরলেন।
আমি অবাকের একদম শেষ পর্যায়ে চলে যায়। হাত পা একদম বরফ হয়ে যায়। বিষ্ময়কর চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। আমি বুঝতে পারছিলাম না যে এইটা স্বপ্ন নাকি বাস্তব।
প্রায় ১ মিনিট পর সে সরে আসে। আমি এখনো মূর্তির ন্যায় দাড়িয়ে আছি।
সে কাছে এসে তার কপালের সাথে আমার কপাল মিলিয়ে দাড়িয়ে থাকে৷ দুই হাত আমার দুই গালে রেখে একদম স্লো ভয়েসে বলে।
.
— তোমার মুখে যাতে আমি আর কখনো ” ডিভোর্স” শব্দটা না শুনি। তা না হলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না!!
.
আমি এইবার চোখ বন্ধ করে জোরে এক শ্বাস নিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেই আর চেঁচিয়ে বলি,
.
— কেন!! কেন বলবো না? কিসের অধিকারে বলছেন আপনি আমায় এইসব আপনি!! বিয়ে হয়ে গিয়েছে বলে এখন স্বামীর অধিকার ব্যবহার করছেন??
.
— রাগ উঠিও না!!
.
— রাগ আমি উঠাচ্ছি না আপনি!! খেলনা পেয়েছেন আমায়!! যেমনে ইচ্ছা সেমনে চালাবেন, অধিকার দেখাবেন তারপর অভক্তি এসে পড়লে ছুঁড়ে ফালাবেন!!
বলুন কেন করছেন আমার সাথে এমন??কেন!! নিজ থেকে যখন দূরে সরে যেতে চাচ্ছি তখন কেন আমায় যেতে দিচ্ছেন না। কেন এই মিথ্যা নামক এক বিবাহের বন্ধনে জড়িয়ে রাখতে চাইছেন আমায়?? কেন!!
.
রিয়ান আমার বাহুদ্বয় দুটো চেপে ধরে বলে,
— Because I love you damn it!!! কিছুটা চেঁচিয়ে।
.
কথাটা আমার কানের আসার সাথে সাথে আমি পাথর হয়ে যাই। নড়া চড়া যেন একদম ভুলে যাই। শুধু স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছি। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না যে সে আমায় ভালবাসে!! আমায়!! আমি কোন মতে কাঁপা কাঁপা গলায় বলি।
.
— কককি বববলেন আপনি!! আআআবার ববলুন না প্লিজ।
.
সে আমার কপালের সাথে তার কপাল ঠেকিয়ে বলেন।
— কখনো বলা হয় নি জানি। কিন্তু আজ বলছি, ভালবাসি তোমায় রিয়ুপাখি খুব বেশি ভালবাসি। কখন কিভাবে ভালবেসে ফেলেছি আমি নিজেও জানি না। শুধু এখন এতটুকু জানি তোমাতে আমি আসক্তি হয়ে উঠেছি। যার থেকে আমার কোন নিস্তার নেই।
এখন আমার এই আসক্তির যে তোমায় বড্ড প্রয়োজন!! তুমি নামক আসক্তি যে আমায় ঝেঁকে ধরেছে।
জানি না তুমি কি আদো আমায় ভালবাসো কি না!! কিন্তু আমি চাই তুমি সবসময় আমার পাশেই থাকো!! আমার আসক্তি হয়ে।
শেষে শুধু একটাই প্রশ্ন করতে চাই,
ভালবাসো কি আমায়??
.
আমি আর কিছু না ভেবে তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেই আর বলি।
— হ্যাঁ ভালবাসি অনেক বেশি ভালবাসি। সারাজীবন আপনার সাথে থেকেই কাটাতে চাই। আপনার আসক্তি হয়েই পাশে থাকতে চাই।
.
রিয়ান এক প্রশান্তির হাসি হেসে আমার জড়িয়ে ধরে। আর বলে,
— সবসময় মনে রাখবে #আমার_আসক্তি_যে_তুমি।
.
.
???
.
.
গ্রামবাসীদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে এসেছি নিজেদের গন্তব্যে। আজ নিজেকে কেন জানি পুরিপূর্ণ মনে হচ্ছে। হয়তো আমি আমার ভালবাসা পেয়েছি বলে। আপন বলতে কাউকে পেয়েছি বলে। নিজের একাকিত্ব জীবনে কোন সঙ্গী পেয়েছি বলে। যে আমায় সবসময় আগলে রাখবে।
ক্যাম্পে এসে রিয়ান আর আমি একটু বিশ্রাম নিয়ে যে যার যার কাজে লেগে যাই। আমি আগেই রিয়ানকে বলে দিয়েছি যে আপাতত আমাদের বিয়ের কথা কাউকে না জানাতে। এখন যদি সবাই এই নিয়ে কিছু জানে তাহলে হয়তো সবাই বিষয়টা অন্য ভাবে নিবে। রিয়ানও বিষয়টা বুঝতে পেরে রাজি হয়ে যায় আর বলে ঢাকায় গিয়ে একবারে সে ধুমধামসে আমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করবে। আমি আর কিছুই বলি না শুধু স্মিত হাসি।
.
.
??
.
.
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে এসেছে। সাথেই আকাশে তারারা এসে ভীড় জমিয়েছে। দূর পাহাড় হতে শেয়ালের হাক শুনা যাচ্ছে। ঝিঁঝিঁ পোকারাও তাল মিলাচ্ছে। মাঝে মধ্যে দামকা হাওয়া বয়ে চলছে। আর সেই সাথে ঘাসেরাও মনের সুখে দুল খাচ্ছে।
আমি উঁচু টিলাটার উপর বসে আছি। সাথে রিয়ানও আছে। আমি রিয়ানের কাধে মাথা রেখে আকাশ দেখতে ব্যস্ত। রিয়ান এক হাত দিয়ে আলতো ভাবে আমায় জড়িয়ে ধরে আছে। আমার ভিতরে যেন প্রশান্তি ঢেউ বয়ে চলেছে। কখনো ভাবি নি যে নিজের ভালবাসার মানুষকে আপন করে পাবো। আজ সত্যি সারুকখানের সেই মোস্ট ফেমাস ডাউলোগটা মনে পড়ছে,
.
” আগার কিসি চিজ কো তুম দিল সে চাহো তো পুরি কায়নাত উসকো তুমসে মিলানে কি সাজিস মে লাগ জাতি হ্যায়।”
.
আজ সত্যি মনে হচ্ছে যেন কথাটা ১০০% সত্যি। আমি এই ভেবে মুচকি হাসতে থাকি। রিয়ান তা খেয়াল করে ভ্রু কুচকিয়ে আমার দিকে তাকায় তারপর বলে,
.
— কি এইভাবে মুচকি মুচকি হাসছো কেন??
.
মাথা উঠিয়ে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে।
— এমনেই।
.
— হুহ!
.
— খারুস!! বিরবির করে। আচ্ছা আমার না একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল!
.
— করো। জিজ্ঞেস করতে হয় নি আমার। আমার নাক টেনে দিয়ে।
.
— আপনি আমায় আগে কেন বলেন নি আপনি আমায় ভালবাসেন। তার উপর যখন ভালোইবাসতেন তাহলে আমার সাথে ওমন খারুস মার্কা বিহ্যাভিওর কেন করতেন?? উত্তর দিন!!
.
— বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু কেন জানি বলে উঠতে পারি নি। ভেবেছিলাম ঢাকায় দিয়ে না হয় একবারেই বলবো। কিন্তু তার আগেই এইসব হয়ে যায়। আর তার উপর তুমি সেই দিন ডিভোর্স কথা বলাতে আমার মাথায় রাগ উঠে যায়। তাই সেই দিনই একবারে মনের কথাটা বলে দেয়।
আর রইলো ওমন ব্যবহার কেন করতাম! তোমাকে আমার আবিরের সাথে সহ্য হতো না তাই যখনই তোমাদের একসাথে দেখতাম মাথা গরম হয়ে যেত আর যার জন্য তোমার সাথে ওমন বিহ্যাভ করতাম। আবার অনেক সময় তুমি বেশি বুঝো বলে রাগ লাগতো তাই এমন বিহ্যাভ করতাম।
.
— হুহ হিংসুটে!!
.
— এত দিন তো শুধু খারুস ছিলাম এখন হিংসুটেও!!
.
— আপনি খারুস ওয়ালা হিংসুটে। এই বলে আমি এক দৌড় দেই।
.
— তবে রেএএ!! রিয়ানও আমার পিছে পিছে চলে আসে।
.
.
?
.
এইভাবে খুনসুটির মধ্যে আমাদের দিন পার হয়ে যায় আর ঢাকা যাওয়ার সময়। রাঙামাটির এই অমূল্য কিছু উপহার আর স্মৃতি নিয়ে চলে আসি ঢাকাতে। যে এক পরিচয় নিয়ে ঢাকা থেকে বেড়িয়েছিলাম আজ ঠিক অন্য পরিচয় নিয়ে ফিরছি। যেই শহরে আগের আমার আপন বলতে কেউ ছিল সেখানে এখন আমার সবচেয়ে আপন বলতে কেউ আছে। রিয়ান আছে!!
এইসব ভেবেই এক প্রশান্তি ছেয়ে যায় আমার মনে।
পুরো রাস্তায় রিয়ানের সাথে দুষ্টুমি করতে করতেই চলে আসি ঢাকাতে। শুরু হয় নতুন জীবনের নতুন অধ্যায়।
.
.
???
.
.
অন্ধকার আচ্ছন্ন এক রুমে প্রায় ৩ দিন যাবৎ আবির বন্ধি হয়ে আছে। চেয়ারের সাথে তার হাত পা আটকানো। চোখ দুটো কালো কাপড় দিয়ে বাধা।
এমনকি খাবার পানি সব বন্ধ তার। গতকাল খুব কাতরিয়েছিল বলে কেউ এসে তাকে পানি খাইয়ে দিয়ে যায়।
আবির তখন ঝিমুচ্ছেছিল ঠিক তখনই দরজা খুলার আওয়াজ হয়। তারপর এক বালতি পানি ওর উপর ঢালা হয়। আবির ধরফরিয়ে উঠে। কেউ একজন এসে ওর চোখের কাপড়টা খুলে দেয়। ৩ দিন চোখে আলো পড়ায় আবির চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলে। চোখে তার আলো সইছে না। বড্ড কষ্ট হচ্ছে তাকাতে। প্রায় অনেকখুন পর সে নিভু নিভু ভাবে চোখ খুলার চেষ্টা করে। সে আবছা আবছা চোখে দেখে কেউ ওর সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। হাতের ধারালো একটা ছুঁড়ির ধার মাপছে সে। বার বার চোখ বুঝছে আর খুলছে কিন্তু কিছুতেই সামনে থাকা ব্যক্তিটি চেহেরা স্পষ্ট দেখতে পারছে না। বহুত কষ্টে চোখ বড় বড় করে তাকানো চেষ্টা করব। আর সামনে যাকে দেখে সে একদম অপ্রস্তুত হয়ে যায়। সে অবাক হয়ে বলে।
.
— রিয়ান তুই!!!