অন্যদিকে নিস্তব্ধ এক প্রহরে রাতের অন্ধকারে কেউ একজন পৈচাশিক হাঁসিতে মেতে উঠেছে। স্তব্ধ পরিবেশটিও যেন তার হাসিতে কেঁপে উঠছে। দূর থেকে হিংস্র শেয়ালের হাঁকটিও যেন এই হাসির সাথে তাল মিলাচ্ছে।
হাতে থাকা ড্রিংকসের গ্লাসটি সমান তালে ঘুরিয়েই চলেছে আর হেসে চলেছে। চোখ মুখে এক তৃপ্তির ছোঁয়া।
সে আর কেউ নয় বরং আবির।
তার সামনেই কাঁচুমাচু হয়ে দাড়িয়ে আছে সূর্য। আবিরের এই ভয়ংকর হাসিটা তার শরীরে কম্পন সৃষ্টি করছে। শরীরটা বার বার কাটা দিয়ে উঠছে। আবির নিজের হাসি থামিয়ে বাঁকা হাসতে থাকে আর ড্রিংকসের গ্লাসে সিপ করতে থাকে।
সূর্য অনেক ধরেই আবিরকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না। অবশেষে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠে।
.
— এএএকটা ককথা জজিজ্ঞাস ককরি স্যার??
.
— হ্যাঁ করো!!
.
— আপনি রিয়ানা ম্যামকে নিজেই ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিলেন তার পর নিজে গিয়েই তাকে বাঁচালেন!! কিন্তু কেন?? এতে লাভ কি হলো?? আমি যতটুকু জানি আপনি রিয়ানা ম্যামকে ভালবাসেন তাহলে তাকে বিপদের মুখে কেন ফেললেন??
.
আবির বাঁকা হেসে উঠে দাড়ায় তারপর ধীর পায়ে সূর্যের দিকে এগিয়ে আসে। আবিরকে এইভাবে আসতে দেখে সূর্যের গলা শুকিয়ে যায়। পা রীতিমতো কাঁপতে শুরু করে। আবির ওর সামনে এসে ওর কাধে হাত রাখে তারপর বলে,
.
— অন্য দিন আমায় এমন প্রশ্ন করার দুঃসাহস দেখালে হয়তো তোমায় কঠোর হতে কঠোর শাস্তি দিতাম কিন্তু আজ আমার মন অনেক ভালো তাই বেঁচে গেলে। আজ যা জানতে চাও সব কিছুর উত্তর দিব আমি। বাঁকা হেসে!!
.
প্রথমে আবিরের এমন কথায় সূর্যের জান যায় যায় অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। দম বন্ধ হয়ে এসেছিল কিন্তু আবিরের শেষের কথায় সে স্বস্তির নিশ্বাস নেয়। কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামগুলো মুছে নেয়। তারপর আগ্রহ নিয়ে আবিরের মুখের দিকে তাকায় আবিরের কথা শুনার জন্য।
আবির সূর্য থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে তারপর পায়ে পা তুলে বলে।
.
— যখন কোন জিনিস সোজা আঙুলে না পাওয়া যায় তখন আঙুল বেঁকা করতে হয়!! তেমনেই রিয়েল লাইফেও কখনো হিরো সাজতে হলে তার আগে ভিলেন সাজতে হয়!!ভালবাসার একটা খুব প্রচলিত কথা তো জানোই,
“Everything is fair in love and war.”
.
সূর্য হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ায়।
.
— ঠিক তেমনেই আমার বেলায়ও সেম। ভালবাসাকে পেতে আমি একটু বাঁকা পথ বেছে নিয়েছি। যেখানে ভিলেনও আমি আর হিরোও আমি। রিয়ানাকে নিজের আরও কাছে আনতে ওকে বিপদের মুখে ঢেলে দেওয়া আবশ্যক ছিল। ওর জীবনের একটা অংশে আমার অস্তিত্ব তৈরি করা অনেক জরুরি ছিল তাই তো এত কারসাজি করা। কিছু পাওয়ার জন্য কিছুটা রিস্ক নিতেই হয়। বলে আবার বাঁকা হাসে।
.
— আচ্ছা স্যার আরেকটা জিনিস জানতে চাই!!
.
— কি??
.
— ড. রিয়ানের সাথে আপনার কিসের সম্পর্ক??
.
রিয়ানের নাম শুনতেই আবিরের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। চোখ মুখ লাল হয়ে যায়। এক হিংস্রতা প্রকাশ পায় তার চেহারায়। হাতে থাকা গ্লাসটা সে ছুড়ে মারে আর চিল্লিয়ে উঠে।
.
— জাস্ট গেট লোস্ট ফ্রম হিয়ার!!! তোর সাহস কেমনে হয় আমাকে এই প্রশ্ন করার??? কিছু করার আগে বেড়িয়ে যা এইখান থেকে!! তা না হলে আজ তোর কোন ক্ষতি করে বসবো আমি!!
.
সূর্য আর কিছু না বলে দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে আসে তা না হলে আজ ওর রক্ষা নেই। ভয়ে ওর সারা শরীর থরথর করে কেঁপেই চলেছে।
.
.
???
.
.
কিছুক্ষণ আগেই সূর্যমামা তার কিরন চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে এক মিষ্টি সকালের আহবান জানিয়েছেন। সূর্যের মিষ্টি আলো পাহাড়ের গায়ে পড়তেই তারা যেন প্রানবন্ত হয়ে উঠেছে।আকাশে বসেছে সাদা মেঘের সমারোহ।পাখিদের মধুর ধ্বনিতে মেতে উঠেছে পরিবেশ।
সাথে এক শীতল হাওয়ার ছোঁয়া।
এমন এক সকাল যে রিয়ানা কখনো পাবে তা সে ভাবতেই পারেনি। প্রকৃতিকে উপভোগ করতে করতে হেটে চলেছে সে এক শূন্য পথে।
আজ সকলের আগেই তার ঘুম ভেঙে যায়। তাই বেরিয়ে পড়ে এই সুন্দর প্রকৃতিটাকে দেখায় জন্য।
হাটতে হাটতে তার সামনে একটি গাছ এসে পড়ে। সে তাকিয়ে দেখে কাঠগোলাপের গাছ। গাছ ভরতি গুচ্ছো গুচ্ছো কাঠগোলাপ। রিয়ানার বড্ড ইচ্ছে করলো ফুল গুলোকে ছুঁয়ে দিতে। সে হাত বাড়িয়ে ফুল ধরতেই টুপ করে ফুলটি তার হাতে এসে পড়ে। তাই সে ফুলটি নিয়ে ঘ্রাণ শুকতে শুরু করে।
হুট করেই তার সেই চিঠি পেরকের কথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে যায় যে তার শেষ চিঠিটা এই কাঠগোলাপের সাথেই দিয়েছিল। রিয়ানা গাছের নিচে বসে এক ধ্যানে ফুলটির দিকে তাকিয়ে থাকে।
তখনই কোথ থেকে একটি আওয়াজ ভেসে আর তার কানে। সে পিছে ঘুরে দেখে এক যুবতি মেয়ে এক বৃদ্ধা মহিলার সাথে বসে আছে। বুঝাই যাচ্ছে এরা এখানকার স্থানীয় না। হয়তো ঘুরতে এসেছে। আর সে জিজ্ঞেস করছে,
.
— আচ্ছা দিদা ভাললাগা আর ভালবাসায় পার্থক্য কি? দুইটাই কি এক?
.
— নারে দুইটা এক না। দুইটাই আলাদা আলাদা। ভালবাসা তো এক শুভ্র অনুভূতি যা একবার ঝেঁকে ধরলে আর ছাড়তেই চায় না। আর ভাললাগা সে তো ক্ষনস্থায়ী। যখন তখন ছেড়ে চলে যেতে পারে।
ভাললাগার বিষয়বস্তু আছে কিন্তু ভালবাসার নেই। ভাললাগার হাজার কারণ আছে কিন্তু ভালবাসার একটাও না। অনেক সময় আমরা ভাললাগাকে ভালবাসা মনে করি। কিন্তু যখন ভালবাসার অনুভূতি যখন ঝাপটে ধরে তখন ভাললাগার কোন কিছুই আর মনে থাকে না। তাই বলা যায় ভালবাসার অনুভূতি গুলোই ভিন্ন।
.
.
তার কথা গুলো শুনে এইবার রিয়ানা বুঝতে পারে যে, ফুল পেরকের প্রতি তার না বুঝা অনুভূতি গুলো আসলে কি ছিল!! ফুল পেরক শুধু মাত্র তার ভাললাগা ছিল ভালবাসা নয়। কেন না রিয়ানের জন্য ও যে অনুভূতি অনুভব করে ওর কথা ভাবলে যেই অনুভূতিটা হয় তা কখনোই এই ফুল পেরকের জন্য হয়নি। সে তো তার এক বদঅভ্যাস ছিল মাত্র যা ছুটে যাওয়ায় তার হালকা কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সেই কষ্টটাও হারিয়ে যায়। প্রথমে তো সে ভেবেই ছিল হয়তো এইটাই ভালবাসা। কিন্তু না রিয়ানকে জানার পর বুঝেছে ভালবাসা কি!!
রিয়ানা নিজের মাথায় এক চাটি মেড়ে বলে।
.
— কত বোকা ছিলাম না আমি!! ভাললাগাকে ভালবাসার নাম দিয়ে বসেছিলাম। হয়তো রিয়ানকে ভাল না বাসলে এর তফাৎ কোন দিন বুঝতেই পারতাম না। কিন্তু তাতেও কি!! শেষ পর্যন্ত দুটোই আমার লাইফে অদৃশ্য। এই ভেবে আমি দীর্ঘ শ্বাস নেই।
ফুলের গুচ্ছোটা কানে গুজে উঠে দাড়ায় আবার হাটা ধরে সে।
।
।
[[ যারা যারা বলেছিলেন রিয়ানা এমন মেয়ে কেন?? যে কিছুদিন আগেই ফুল পেরকের জন্য ভালবাসা উথলিয়ে পড়ছি আজ আবার রিয়ানের জন্য!! কিছুদিন যেতে না যেতেই আগের প্রেম উদাও??
আচ্ছা আমি কি একবারও বলেছিলাম বা ক্লিয়ারি ফাই করেছিলাম যে রিয়ানা সেই ফুল পেরককে ভালবেসে ফেলেছে?? আমার মতে না!! আমি জিনিসটা ধোয়াশাই রেখেছিলাম। যা পরবর্তীতে আমি এমনেও ক্লিয়ার করে দিতাম। বাট আপনাদের জন্য এই কথাটা আগে ক্লিয়ার করলাম। এইবার ক্লিয়ার তহ রিয়ানার মনে কি ছিল!! ফুল পেরক রিয়ানার শুধু ভাললাগা ছিল ভালবাসা না।
এমনেই যদি কেউ আমাদের জন্য কিছুটা করে তখনই আমাদের মনে তার জন্য ভাললাগা সৃষ্টি হয়ে যায় আর ওইটা যদি দীর্ঘ দিন যাবৎ হয় তখন ভাললাগাটা আরও প্রখর হয়। কিন্তু সেটা ভালবাসা ধরা বকামি। এইটা শুধু ভাললাগা আর কিছুই না। যা আপনারা গুলিয়ে ফেলেছেন।
অবশ্য এইটা আমার ব্যর্থতা যে আমি আপনাদের তা বুঝাতে পারি নি। হয়তো বা আমি
দুইটা ফিলিংস একত্রিত করে ফেলেছিলাম যার জন্য আপনাদের বুঝতে পারেন নি। এর জন্য আমি দুঃখিত । ]]
।
।
??
.
.
সকাল থেকেই রিয়ান চারদিকে খালি রিয়ানকেই খুঁজে বেড়িয়েছে। কিন্তু কোথাও তার হদিস খুঁজে পায় নি। পড়ে একজন থেকে জানতে পারে যে রিয়ানাকে সে ওইদিকটাতে যেতে দেখেছিল।
রিয়ান আর কিছু না ভেবে সেই দিকে চলে যায়।
বেশ খানিক দূর যেতেই সে রিয়ানাকে পায় ঠিকই কিন্তু সে যা দেখলো তাতে ওর মাথা গরম হয়ে যায়। চোখ দুটো লাল হয়ে যায়। হাত দুটো মুষ্টি বদ্ধ করে ফেলে। সে দেখতে পায়…