সিজন 1 অধ্যায় 17 পারিবারিক ড্রামা #ভাইদের দ্বন্দ্ব #অতীতের দুঃসহ স্মৃতি রিয়ানা রহমান সাদাত খান রিয়ান

অতীতের জমাট বাঁধা ঘৃণা

10 মিনিট পড়া 1,577 শব্দ
অতীতের জমাট বাঁধা ঘৃণা

আড্ডা শেষে সকলেই যে যার রুমে চলে যাই। আমার ভালো লাগছিল না বলে আমি সেই টিলার দিকে চলে যাই। আকাশে আজ সাদা সাদা মেঘের ভেলা। তার মধ্যেই চলছে অজস্র তারার লুকোচুরির খেলা। বাইরে বেশ বাতাস বইছে। শীতল এক পরিবেশ। আমি ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছি ঠিক এমন সময় কানে কাউরো কন্ঠ ভেসে আসে। কেউ হয়তো বা গান গাইছে। গানের আওয়াজটা বেশ টানছে আমায়। তাই আর থাকতে না পেরে ছুটে চলি সেই গানের দিকে। আওয়াজটা টিলার ওইখান থেকেই আসছে তাই আমিও সেইদিকেই যাই। গিয়ে দেখি কেউ একজন টিলার উপর বসে আকাশের পানে তাকিয়ে গান গাইছে। আমি তার সামনে যেতেই চমকে যাই এ আর কেউ বরং রিয়ান।

রিয়ান চোখ বন্ধ করে আনমনে গেয়েই চলেছে।

.

” ❤Kal Raaste Me, Gham Mil Gaya Tha,

Lag Ke Gale Main… Ro Diya…

Jo Sirf Mera, Thaa Sirf Meraa

Maine Usse Kyun Kho Diya…

Haan Wo Aankehin Jinhein Main, Choomta Tha Bewajah…

Pyaar Mere Liye Kyun, Unme Baaki Na Rahaa…

Humnawa Mere, Tu Hai Toh

Meri Saansein Chalein,

Bata De Kaise Main Jiyunga

Tere Bina❤”

.

.

গান শেষে রিয়ান পাশে তাকাতেই আমাকে দেখে চমকে উঠে। সে এই সময় হয়তো বা আমায় এইখানে আশা করে নি। সে চোখ ঘুরিয়ে বলে।

.

— এত রাতে এইখানে কি করছো??

.

— ভালো লাগছিল না তাই এইখানে হাটতে এসেছিলাম। এসে আপনাকে পেলাম। আচ্ছা আপনি তহ এত সুন্দর গান গাইতে পারেন তাহলে সে সময় গান গাইলেন না কেন??

.

— ইচ্ছে করে নাই তাই!!

.

— হুহ!! আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি??

.

— করো!

.

— এত আবেগ নিয়ে কার জন্য গান গাইছিলেন?? আপনার গানে বুঝা যাচ্ছিল যে গানটা আপনি কাউকে উদ্দেশ্য করে গাইছিলেন। কে সে??

.

রিয়ান আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলে।

— নান অফ ইউর বিজন্যাস। গম্ভীর গলায়

.

কথাটা শুনার পর আমার রাগ হয় অনেক। আবার এইটা ভেবে কান্না আসছে যে তার লাইফে হয়তো অন্য কেউ আছে। খুবই বিশেষ কেউ যার জন্য এত আবেগ দিয়ে তিনি গান গাইছিলেন। যদি তার জীবনে কেউ থেকেই থাকে তাহলে সকালে ওইটা আমার সাথে কি করলো?? কেন আবার আমার মনে তার জন্য সেই সুপ্ত অনুভূতি গুলো জাগিয়ে তুললো। কেন!!

আমি আর নিজের মধ্যে কথাগুলো চাপা রাখতে পারছিলাম না। বেশ কষ্ট হচ্ছিল আমার তাই চুপচাপ চলে আসতাম নিলাম। যেই না নেমে আসতে নেয় ঠিক তখনই হাতে টান অনুভব করি। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি রিয়ান এক হাত দিয়ে আমার হাত ধরে আছে। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রই। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলে।

.

— একটু থাক না আমার পাশে বসে।প্লিজজজ!! করুন কন্ঠে।

.

তার এমন করুন কন্ঠ শুনে আমার বুকটা ধুক করে উঠে। তার এই করুন কন্ঠকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা আমার নেই। তাই আগের ন্যায় চুপচাপ বসে রইলাম। দুইজনের মধ্যেই পিনপিন নিরবতা।

হঠাৎই আমার মাথায় আবিরের কথাটা আসে। সাথে দুইজনের প্রতি দুইজনের সেই ব্যবহার গুলো। কোন এক সম্পর্ক যে তাদের মধ্যে বিরাজমান তা অনেক ভালো করেই বুঝতে পারছিলাম কিন্তু তা কি?? আবির আর রিয়ানের যখনই সংঘর্ষ হয় তখনই তাদের হাব ভাব বদলে যায়। যেন দুইজন দুইজনকে চোখের সামনে সহ্যই করতে পারে না। কিন্তু কেন?

এইটা নিয়ে কৌতূহল জন্মাতে শুরু করে। শেষে নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে জিজ্ঞাস করে বসি।

.

— আচ্ছা আবির আর আপনার মধ্যে সম্পর্ক কি?? না মানে আপনাদের দুইজনের ব্যবহারে বুঝা গেল যে আপনারা দুইজন দুইজনকে অনেক ভালো করেই চিনেন। কিন্তু আপনাদের মধ্যে সম্পর্কটা বন্ধুসলুভ না বেশ কর্কশ প্রকৃতির। বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম কিন্তু সময় ও সুযোগ হয়ে উঠে নি। তা আজ কি আমায় বলা যাবে প্লিজজজ!!

.

রিয়ান একবার আমার দিকে তাকায়। তারপর এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলে।

.

— আবির আমার চাচাতো ভাই।

.

— ভাই!! তাহলে তো আপনাদের মধ্যে অনেক ভালো সম্পর্ক হওয়ার কথা কিন্তু আপনাদের দেখা যা বুঝেছি দুইজন দুইজনকে সহ্য করতে পারেন না। এমন কেন??

.

— জানতে চাও এর কারণ কি??

.

— হ্যাঁ!! প্লিজ বলুন না।

.

— তাহলে শুনো….

.

??

.

আমার মা আমায় জন্ম দেওয়ার সময়ই মারা যায়। তখন থেকে বাবাই আমায় একা হাতে বড় করতে শুরু করে।

আমার যখন ২ বছর তখন আমার চাচা বিয়ে করে। চাচী আসাতে আমি মায়ের ভালবাসাটা কি তা বুঝতে শুরু করি। তিনি এসেই আমার দ্বায়িত্ব নিজের কাধে নিয়ে নিলেন আর আমায়ও বলেন আমি যেন তাকে “মা” বলেই ডাকি। সেই থেকে আমি “মা” বলেই ডাকতাম। তিনি আমায় সবসময় নিজের ছেলের মত আগলে রাখতেন।

আমার যখন ৪ বছর তখন আবির জন্ম হয়। আবির আশাতে পরিবারে খুশির স্রোত বোয়ে যায়।

কিন্তু এর মধ্যেও আমার প্রতি কাউরো ভালবাসা একটুও নরবর হয় নি। বিশেষ করে চাচীর। চাচী আমায় সেই আগের মতই ভালবাসতো এমনকি আবিরের থেকে বেশি আমার যত্ন নিত যাতে আমি এইটা না ভাবি যে আবির আশায় আমায় জন্য তার কাছে কোন জায়গা নেই।

এইভাবেই কাটছিল দিন। আবিরও আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। ছোট থেকেই ও আমায় সহ্য করতে পারতো না। ওর ধারণা আমি ওর ভাগের ভালবাসা নিয়ে নিচ্ছি। এ নিয়ে ও আমার সাথে প্রায় সময় ঝগড়া করতো।

আমার যখন ১০ বছর তখন বাবা হার্ট স্টোক করে আর পারি জমান ওপারে। বাবা মারা যাওয়াতে প্রচুর ভেংগে পড়েছিলাম তখন চাচা,চাচীই আমায় সামলায়। তারা আমায় নিজের বড় ছেলে হিসাবে পরিচয় দেওয়া শুরু করে। তারপর তারা আমায় আর আবিরকে নিয়ে উত্তরাতে শিফট হয়ে যান।

আমাকে সাথে আনার ফলে আবির একদম খুশি হয় নি। ওর মনে কোথ থেকে একটা কথা গেথে গিয়েছিল যে আমি ওর বাবা, মাকে ওর থেকে কেড়ে নিয়ে যেতে এসেছি। তাই ও সবসময় আমার সাথে বাঝে ব্যবহারই করতো। কিন্তু তাও আমি কিছু বলতাম না ভাবতাম ছোট মানুষ তাই এমন করে।

কিন্তু আমার প্রতি ওর ঘৃণা দিন দিন বেড়েই চলেছিল। আমি সবসময় টপ করতাম আর আবির টেনেটুনে পাশ করতো। এতে চাচা, চাচী আমার থেকে কিছু শিখতে বললে ও চেঁচামেচি করতো। আমার নামও সহ্য করতে পারতো না। এর জন্য আমাদের মধ্যে বেশ কথা কাটাকাটি হয়।

একবারও জিদে আমার সকল বই খাতা ছিড়ে ফেলে আর তাতে আগুন লাগিয়ে দেয়। যার জন্য আমার অনেক জীদ উঠেছিল। ওর সাথে আমার বেশ মারামারি হয়। তখন চাচী এসে আমাদের থামায় আর সব শুনে চাচী ওকে থাপ্পড় মেরেছিল। এর পর থেকেই সে আমাদের থেকে আলাদা হয়ে যায়।

নিজের নাম থেকে “খান” সরিয়ে ফেলে। ওর মতে “খান” নামটা ওর সাথে থাকা মানে নিজেকে আমার ভাই হিসাবে পরিচয় দেওয়া।

এইভাবে বড় হয়ে উঠি আমরা। দুইজনের মধ্যে প্রায় দন্দ লেগেই থাকতো। একবার ও আমায় যা নয় তাই বলে এমন কি আমার মাকে নিয়ে বাজে বলে। তখন আর থাকতে পারি নি। ইচ্ছা মত মেরেছিলাম ওকে। এরপর থেকেই আমিও ওকে সহ্য করতে পারতাম না।

এর মধ্যে আমি চাচা চাচীকে বলে লন্ডনে চলে যাই পড়ালেখার জন্য। কারণ ওর সাথে থাকার রুচিটাই আমার উঠে গিয়েছিল।

সেখানে গিয়ে প্রায়ই সকলের সাথে কথা হতো শুধু আবিরকে বাদ দিয়ে। একবার যখন ফোন দেই তখন আবির ফোন ধরে আর চিল্লাপাল্লা শুরু করে আর আমায় বলে আমি যেন আর ফোন না দেই।

তাই আমিও জিদে দেশে আর ফোন দেই নি। চাচা চাচী যোগাযোগ করতে চাইলে আমি সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেই।

এর পর যখন দেশে আসি তখন জানতে পারি ১ বছর আগেই চাচা চাচী একটা কার এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছে। অথচ আমায় কেউ জানায় পর্যন্ত নেই।

তখন আবিরকে গিয়ে জিজ্ঞাস করি যে ও কেন আমায় জানাই নি যে চাচা চাচী মারা গেছে। তখন ওর উত্তর ছিল,

” আপনি আমার বাবা মার কিছু হন না তাই আপনাকে জানানো প্রয়োজনবোধ করি নি। তাদের লাশ উঠানোর জন্য তাদের ছেলে এইখানে ছিল তাই কোন বাহির মানুষকে ডাক দেওয়া বা জানানোর নিম্নতম ইচ্ছা আমার ছিল না।”

সেইদিব থেকে আমি ওকে আরও দেখতে পারি না। ওর প্রতি এক ঘৃণা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল আমার। যারা আমায় ছোট থেকে এত বড় করলো তাদেরকে শেষ দেখাটাও ও আমায় দেখতে দেয় নি।

সেই থেকে আমরা দুইজন দুইজনের পরম শত্রু হয়ে উঠেছিলাম। দুইজন দুইজনের ছাঁয়াও সহ্য করতে পারতাম না।

.

.

??

.

এই বলে রিয়ান থামে। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আবিরের মনে যে রিয়ানের জন্য এত ঘৃণা তা বুঝতে পারি নি কখনো। আমি কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করে বলি।

.

— আমি বুঝতে পারছি আপনার ফিলিংস বাট আমার মতে আবির যা করেছে তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক নয়।

.

রিয়ান আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে বলে।

— মানে?? কি বলতে চাও তুমি??

.

— এইটাই যে আবির হয়তো বা নিজের দিক দিয়ে ঠিক। কেন না কোন বাচ্চাই তার মা বাবার ভালবাসার ভাগ অন্য কাউকে দিতে চায় না। আবিরের বেলায়ও ঠিক তাই। ছোট বেলা থেকেই ও এইটা বুঝে এসেছে যে সবাই আপনাকে বেশি ভালবাসে ওকে না। আপনার জন্য ওর ভালবাসা কমে গেছে। তারপর যখন আপনি ওর বাসায় থাকতে শুরু করেন তখন ওর মনে এইটা গেধে গিয়েছিল যে আপনি হয়তো ওর ভালবাসায় ভাগ বসাতে এসেছেন। ওর অবুঝ মন বুঝতে পারে নি যে তার বাবা-মাও তাকে ততটাই ভালবাসে যতটা না আপনাকে। সে জন্যই ওর মনে আপনার জন্য হিংসে তৈরি হয়। আর যা দিন দিন বাড়তে থাকে।

ওকে যদি কেউ বুঝাতো যে ও যা ভাবছে তা ভুল বা কেউ যদি ওর এই ভুল ভাঙাতো তাহলে হয়তো এমন হতো না। ওর ভুল ধারণার জন্যই এত কিছু।

ওর সেই ছোট মনে আপনার জন্য যে ক্ষোপ সৃষ্টি হয়েছিল তা দিন দিন বাড়তে বাড়তে এই পর্যন্ত এসে পড়েছে যে ও এখন চাইলেও তা দূর করতে পারবে না। তাই এইসব এ ওর পুরোপুরি দোষ দিলে তা কি অযৌক্তিক।

.

— এইভাবে কখনো ভেবে দেখি নি!!

.

— ঠিক তাই এই জন্যই ওর এই জিনিসটা কেউ বুঝতে পারে নি আর ওর ভুল ধারণাটা কেউ ভাঙাতে পারে নি।

.

— কিন্তু তুমি যাই বলো, ও শেষে যা করেছে তার জন্য আমি ওকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবো না। ছোট থেকে ওর করা সব ভুল ক্ষমা করতে পারলেও এইটা পারবো না। কখনো না। হাল্কা চেঁচিয়ে।

.

আমি আর কিছু বললাম না। শুধু নীরবে এক দীর্ঘ শ্বাস নিলাম।

.

.

???

.

.

সকাল থেকেই তোড়জোড় লেগে আছে। পাহাড়ের বেশ গহীনে ছোট একটি গ্রামে আছে সেখানে নাকি কয়েকজন লোক বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাদের চিকিৎসার জন্য আমাদের বলা হয়েছে। তাই তাদের চিকিৎসার জন্য আমি, রিয়ান আর আরেকজন যাব বলে ঠিক করেছি। তাই সকল জিনিস ঠিক মতো গুছিয়ে নিচ্ছি। সকল প্রস্তুতি শেষে যেই না আমরা বের হতে নিব ঠিক তখনই….

অধ্যায় 17 সমাপ্ত

আপনি এই অধ্যায়টি পড়া শেষ করেছেন। পরবর্তী পর্বে যান অথবা আপনার প্রতিক্রিয়া জানান!

মন্তব্যসমূহ

0

আলোচনায় যোগ দিন

মতামত জানাতে এবং পাঠকদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে লগইন করুন।

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

প্রথম মন্তব্যটি করে আলোচনা শুরু করুন!