ঘুমের ঘোরে কাটিয়ে কিছুটা সজাগ হয়াতে বুঝতে পারছি কেউ আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার হাত ক্রমশ আমার দিকে এগিয়ে আসছে। প্রায় খানিকটা এসেই পড়েছে তখন আমি এক চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠি। তারাতাড়ি করে টেবিল ল্যাপটি জ্বালিয়ে নেই আর চারদিক বুলিয়ে দেখতে থাকি।
না কেউ নেই। কোন খারাপ স্বপ্ন দেখিছি হয়তো। তাও নিজের মনকে বুঝানোর জন্য রুমের এলিডি লাইট জ্বালিয়ে সব জায়গা ভালো মত চেক করে নিলাম। না কেউ নেই।
কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বুকের ভিতরটা বার বার ধুকধুক করেই চলেছে। এক গ্লাস পানি খেয়ে কোন মতে নিজেকে শান্ত করি।
নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করতে থাকি। হঠাৎ নাকে এক পারফিউমের ঘ্রাণ আসে। ঘ্রাণ যেন আমার চিরচেনা। আমি এর আগেও এই ঘ্রাণটা আমার রুমে পেয়েছি কিন্তু আমি তহ এই ঘ্রানের পারফিউম ইউজ করি না। তাহলে এই ঘ্রাণ আসছে কোথা থেকে৷ এইসব ভাবতে ভাবতে খাটে গিয়ে বসি। তখননি নজর পরে জানালার দিকে। জানালা খোলা। তারমানে বাইরে থেকে ঘ্রাণটা আসছে।
তখনই নজর যায় সেই শুকিয়ে যাওয়া ফুলগুলোর দিকে। ফুলগুলো সামনে নিয়ে এসে বসি। পরক্ষণেই মনের মধ্যেই এক আলদা নাড়া দিয়ে উঠে। কিন্তু তাও কোথাও এক ফাঁকা বিরাজমান হয়ে আছেই।
।
।
??
।
।
” ইয়ে ইস্ক মেরি কাবিলিয়াত নেহি মেরি জানুনিয়াত হ্যয়❤
ইস ইস্কমে হাতসে গুজার জানে কি খোয়াইস হ্যয়?
ইয়ে ইস্ক আব তু মুজসে ভি কারেগি?
মেরি দুনিয়া আব তেরি হগি? ”
.
.
— ” ভালবাসার প্রথম ধাপ পেরিয়ে এসেছো তুমি রিয়ু পাখি। আর তুমি সে ধাপে পুরোপুরি সফল। একদিন ফুল আর চিঠি পাঠাইনি বলে তোমার মনের এই হাল। ছটফট করছো আমার খোঁজ জানতে।
তার মানে তোমার মনে আমি জায়গায় করতে সক্ষম। কিন্তু চিন্তা করো না খুব জলদি এই তোমার মন, হৃদয় সবকিছু জুরে থাকবো আমি!! তখন বুকের বা পাশে থাকবে শুধু আমার নাম। ”
এই বলে রিয়ানার ছবির দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে সে।
( হ্যাঁ যা ভাবছেন ঠিক তাই। সেই চিঠি পেরক এই সাইকোটাই)
।
??
।
রাত ৩.৩০ বাজে,
বনানীর হাউজিং কোলানীতে কোন এক গাড়ির Security alarm এর আওয়াজে পুরো কোলানী সজাগ হয়ে যায়। অনেকে ইতি মধ্যে নিচে নেমে আসে ঘটনা বুঝার জন্য। আসার পর তারা যা দেখলো তাতে কেউ মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
কেউ ড. রিয়ানের গাড়ির নাজেহাল অবস্থা করে রেখেছে। পুরো গাড়িতে টেন্ট পড়া আর কাঁদা দিয়ে মাখা মাখি। তার উপর কেমন যেন ইঁদুর মরা গন্ধ আসছে।
এরই মধ্যে ড. রিয়ান নিচে নেমে আসে আর নিজের গাড়ির এই অবস্থা দেখে কিছুটা ভরকে যায়। নিজের গাড়ির এত বাজে অবস্থা দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। সে জোরে জোরে চিৎকার করে ওয়াচ ম্যানকে ডাক দিতে থাকে।
.
রিয়ানঃ ওয়াচ ম্যান!!!!! ওয়াচ ম্যান!!!!!
.
রিয়ানের এমন হুংকার ভরা আওয়াজে সকলেই কেঁপে উঠে। এইদিকে ওয়াচ ম্যান পাহাদারি করতে করতে একসময় চোখ খানিকটা লেগেই এসেছিল। রিয়ানের এমন আওয়াজে সে ধরফরিয়ে উঠে যার ফল স্বরুপ সে চেয়ার থেকে উল্টিয়ে নিচে পড়ে যায়। এরই মধ্যে আবার রিয়ানের ডাক কানে আসে সে কোন মতে নিজেকে সামলিয়ে দৌড় দেয় রিয়ানের কাছে যায়।
।
ওয়াচম্যানঃ জজজ্বী স্যার ববলেন।।
.
রিয়ানঃ আমার গাড়ির এই অবস্থা কে করলো??
.
ওয়াচম্যানঃ আমি জানি না স্যার। গাড়ির দিকে তাকিয়ে।
.
রিয়ানঃ জানেন না মানে কি??? আপনাকে এইখানে কেন রাখা হয়েছে বুঝি না। রাত বেরাতে কেউ আমার গাড়ির অবস্থা এমন করে গেল আর আপনি তেরও পেলেন না বাহ।
.
ওয়াচম্যানঃ আব আমি তহ গেটের পাশেই ছিলাম। কাউকে..
.
রিয়ানঃ জাস্ট শার্ট আপ। কোন সাফাই আমি শুনতে চাই না। যান গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে আসুন।
.
ওয়াচম্যানঃ আব স্যার ইয়ে মানে.. ১ সপ্তাহ ধরে সিসিটিভিটা নষ্ট।
.
রিয়ানঃ হোয়াট দ্যা.. এইখানে কোন ডিসিপ্লিন আছেও নাকি না। জাস্ট রিডিকুলাস। যান এই গাড়ি আমার চোখের সামনে থেকে নিয়ে যান। আমি এক মুহূর্তের জন্যও গাড়িটা দেখতে চাই না।
.
ওয়াচম্যানঃ কোথায় নিব স্যার??
.
রিয়ানঃ গো টু হেল ওইথ ইট। যেখানে ইচ্ছা সেখানে নিয়ে যান চাইলে নিজের জন্য নিয়ে যান বাট আমার সামনে থেকে নিয়ে যান। এই গাড়ি দেখতেও এখন আমার রুচিতে বাধছে।
.
এই বলে রিয়ান গটগট করে চলে যায়।
।
।
??
।
।
— ” হাহা!!! এই গাড়ির তহ এই অবস্থা হওয়ার কথাই ছিল। যে গাড়ি আমার রিয়ু পাখির উপর কাঁদা ছুঁড়েছে সে গাড়িকে কি আমি এত সহজে ছেড়ে দিতে পারি?? উহু একদম না।
গাড়িচালককে আমার রিয়ুপাখি শাস্তি দিলেও গাড়িকে দেয় নি। গাড়িচালক তার শাস্তি পেলেও গাড়িটা পাই নি। তাই তহ আমাকেই গাড়িটার অবস্থা এমন করতে হলো।
আমি জানি তোমায় হাজার মানুষের সাথে কথা বলতে হয়, উঠতে হয়, বসতে হয়। তোমার পেশা যেই এইরকম। তাই তহ সবাইকে তোমার কাছে আসার পরও ছেড়ে দেই। তুমি চিন্তা করো না যারা তোমার বন্ধু সলুভ তাদের আমি কিছু করবো না কিন্তু যে তোমার দিকে বাজে দৃষ্টিতে তাকাবে, তোমাকে ছুঁতে চাবে, তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইবে তার মৃত্যু যে নিশ্চিত।
কিন্তু এইসবের পরেও একটা কথা তোমায় সবসময় মনে রাখতে হবে আর তা হলো “তুমি আমার”। “আমার আসক্তি যে তুমি”।
।
।
এই বলে রিয়ানার ছবিতে ছুঁড়ি দিয়ে স্লাইড করতে করতে গান ধরে,,
।
” ❤ হামে তুমসে পেয়ার কিতনা
ইয়ে হাম নেহি জানতে
মাগার জি ভি নেহি সাকতে
তুমহারে বিনা
হামে তুমসে পেয়ার কিতনা ❤ ”
।
।
???
।
।
আজ “খান হসপিটালে” আমার প্রথম দিন। সকাল থেকে তারাহুড়া করেই চলেছি আমি। আমার যে সবকিছু পার্ফেক্ট চাই। এইটা আমার লাইফের অনেক বড় চান্স তাই এইটা ফুললি কাজে লাগাতে হবে আমার।
তারউপর ড. রিয়ান স্যারের মত একজন পারদর্শী কার্ডিওলজিস্টের আন্ডারে কাজ করার সুযোগ অনেক বড় বেপার। শুনেছি তিনি নাকি বাংলাদেশের বেস্ট কার্ডিওলজিস্টের মধ্যে একজন। হওয়ারই কথা বয়স তহ মনে হয় ভালোই হয়েছে, আর বয়সের সাথে বৃদ্ধিও পেয়েছে তার অভিজ্ঞতা। আমিও হয়তো এমন একজন হতে পারবো কিন্তু তাতে মেবি আগে আমার বুড়িখালাম্মা হতে হবে।
এইসব ভেবেই ফিক হেসে উঠি আমি। তারপর বেড়িয়ে পড়ি। দরজার আশেপাশে একবার ভালো মত উঁকি ঝুঁকি মারি। ফুল দাতা থেকে কিছু এসেছে নাকি। কিন্তু না আসে নি৷
মনটা খারাপ করেই বেড়িয়ে পড়ি ” খান হসপিটালের” উদ্দেশ্যে।
।
।
???
।
।
বনানীর ২৭ নাম্বার রোডে দাড়িয়ে আছি। হুট করেই সিএনজিটা খারাপ হয়ে যায় যার জন্য মাঝ রাস্তায় আমায় নেমে পড়তে হয়।
এখন কোন গাড়ি এই দেখতাসি না। এমনকি রিকশাও নেই। কেমনটা লাগে??
লেট হচ্ছি বলে হাঁটা শুরু করলাম। সামনেই দেখলাম pathao এর গাড়ি দাড়িয়ে আছে। আমার খুশি আর দেখে কে! আমি আর দেরি না করে খপ করে গিয়ে বসে পড়ি সেই গাড়িতে।
।
রিয়ানাঃ ড্রাইভার আঙ্কেল পেসেঞ্জার ইজ রেডি টু ফ্লাই থুরি গো। তহ গাড়ি স্টার্ট করেন?
.
আর কিছু বলার আগেই কানে এক ইংরেজি বেসুরা কাকের কর্কশ কণ্ঠে কানে আসলো।
.
— ” হোয়াট দ্যা হেল!!! ”
.
কথাটা কে বললো তা দেখার জন্য পাশে ঘুরতেই দেখি কালকের ওই কাঁদা ওয়ালা ছেলেটা।? প্রথমে রাগ হলেও নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করতে লাগলাম। কেন না হয়তো তিনি আগেই Pathao বুক করে ফেলেছেন এখন কিছু বললে আমারই লস। কিন্তু তাও মেয়ে মানুষের রাগ কি আর এত তারাতারি কমে। একটু খোঁচা না মেরে কথা বললে কি হয়?।
.
রিয়ানাঃ আরেহ দূর্গন্ধ বিরধী আপনি!!
.
সাদাতঃ হোয়াট ডু ইউ মিন বাই দূর্গন্ধ বিরধী। ?
.
রিয়ানাঃ না মানে কালকে যে পরিমানে দূর্গন্ধ নিয়ে নাক ছিটকালেন তা দেখে মনে হলো আপনি দুর্গন্ধী বিরধী টাইপ মানুষ। দাঁত কেলিয়ে।
.
সাদাতঃ হোয়াট দ্যা.. বেয়াদব মেয়ে এইখানে কি করছো?? নামো গাড়ি থেকে বলছি নামো!!
.
রিয়ানাঃ হুহ! নামুম না। সরকারি পাব্লিক পেয়েছেন নাকি?? যে যা বলবেন তাই করবো? আর এমনেও pathao জনগনের কল্যানের জন্য তাই এখন এইটি আমার কল্যাণ করিতে চলিছে দয়া করিয়া মাঝে খাম্বা হয়ে দাড়িয়ে থাকিবেন না। এর চেয়ে শুদ্ধ ভাবে রিকুয়েষ্ট আমি করতে পারবো না?
.
সাদাতঃ What nonsense is this!! গাড়ি আমি বুক করেছি তাই এইটি আমার কল্যাণ করবে। ধুর কি বলি এইসব! মানে আমি গাড়ি আমায় নিয়ে যাবে।
.
রিয়ানাঃ তাতে কি?? নিজে যাবেন তহ যান কিন্তু একটু দয়ালু হয়ে আমায় লিফট দেন।
.
সাদাতঃ কোন খুশিতে?
.
রিয়ানাঃ আপনার বিয়ে লেগেছে সেই খুশিতে? বাই দ্যা ওয়ে চাইলে দাওয়াত দিতে পারেন আমি মাইন্ড করবো না ☺
.
সাদাতঃ ইউউউ।
.
ব্যাস লেগে গেল ঝগড়া। তখন গাড়ির ড্রাইভার বলে উঠে।
.
ড্রাইভারঃ আরেহ মিয়া দুইজনে চুপ করেন তহ!! দুইজনেই চলেন টাকা হাফ হাফ করে দিয়ে দিয়েন। এমনেও আমার আরেকটা টিপ উঠাইতে হইবো দেরি হইতাসে আমার। যদি আবার ঝগড়া করেন তাহলে এইহানেই নামাইয়া দিমু।
.
তার কথায় দুইজনেই চুপ হলাম। আমি টাইম দেখতে লাগলাম। ইসস!! দেরি হয়ে যাচ্ছে। ছেলেটার দিকে একবার তাকালাম। সেও টাইম দেখছে। বুঝতে পারছি তারও তারা আছে তহ সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বলি।
.
রিয়ানাঃ ও ভাইয়া.
.
সাদাতঃ আমাকে বলছেন? হতভম্ব হয়ে।
.
রিয়ানাঃ হু। দেখুন আমায় লিফট দেন না। আমি তহ আপনার ছোট বোনের মত তাই না? আমায় একটু হেল্প করলে কি হয়? এমনেই লেট হয়ে যাচ্ছি প্লিজ একটু হেল্প করুন না।? অর্ধেক ভাড়া দিয়ে দিব তহ।
.
সাদাতঃ পারলে তহ আমি আপনার মত বেয়াদপ মেয়েকে নিজের দূরসম্পর্কের খাল্লামাও না করি!! বোন তহ দূরে থাক। বিরবির করে।
.
রিয়ানাঃ কিছু কি বললেন ভাইয়া?
.
সাদাতঃ না। ভাড়া দিতে হবে না আপনি এমনেই চলুন।
.
রিয়ানাঃ ইয়াহু। থেংকিউ ভাইয়া। ( ভাইয়া না কচু!! খারুস একটা। মনে মনে)
.
তখন ড্রাইভার বলে।
.
ড্রাইভারঃ কই যাইবেন কোন এলা?
.
দুইজন একসাথেই বলে উঠি “খান হসপিটাল”। বলার দুইজন দুইজনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। কিন্তু ঠিক কিছু বললাম না। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিল।
হঠাৎ আমার মাথায় প্রশ্ন আসলো এই খারুস বেটার গাড়ি কই?? প্রশ্ন আসতে দেরি মাথায় মুখে বলতে নয়।