অতঃপর রিয়ান যা বললো তা শুনার সাথে সাথে আমি ৮২০ ভোল্টেজের ঝাটকা খেলাম। নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম যে এইটা কি আদো সত্যি কিনা। আমি শুধু ড্যাবড্যাব করে রিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকি। তা দেখে রিয়ান বলে।
.
— আজীব তো!! এইভাবে হাবলার মত তাকিয়ে আছো কেন??
.
আমি ধপ করে তার পাশে বসে পড়লাম। ভ্রু দুটো জোড়া লাগিয়ে তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। বুঝার চেষ্টা করতে থাকি তিনি কি আদো মজা করছেন নাকি সত্যি সত্যি বলছেন। না তার হাবভাব দেখে সত্যি মনে হচ্ছে তিনি সত্যি বলছেন। কিন্তু তাও এখনো তার দিকে আমার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বঝিয়ে রেখেছি।
আমার এমন দৃষ্টিতে রিয়ান কিছুটা নড়েচড়ে বসে। আর গলাটা একটু ঝেড়ে বলে।
.
— কিইই??
.
— আপনি একটু আগে যা বললেন তা কি সত্যি??
.
— মিথ্যা বলতে অবশ্যই আমি এত রাতে এত দূর আসে নি!!
.
আমি এইবার খুশির বন্যায় প্লাবিত হয়ে লাফ দিয়ে উঠি আর একটা চিল্লান দেই।
.
— সত্যিইইই!! পরের মাসে আমাদের বিয়েএএএ!!! খুশিতে আত্মহারা হয়ে।
.
রিয়ান সাথে সাথে নিজের কান চেপে ধরে বলে।
— আস্তে মেরি মা আস্তে। কানের পর্দা মনে হয় এইবার গেল। কান ঝাড়া দিতে দিতে।
.
— আরেহ রাখেন আপনার কান!! আগে বলেন সত্যি কি পরের মাসে আমাদের বিয়ে??
.
— আজ্ঞে হ্যাঁ রিয়ুপাখি। পরের মাসের ৫ তারিখ আমাদের বিয়ে।
.
এইটা শুনে আমি কিছুটা চুপসে গেলাম। মাথা নিচু করে বলি।
— আজকে তো ২০ তারিখ। তার মানে ১৫ দিন এ বিয়ে। এত তারাতারি কিভাবে কি?? তার উপর বাকি সবাই বা কি মনে করবে?? কাউকে কিছু বলাও হয় নি। তার উপর আমি একা কেউ নেইও যে আমার পক্ষ হয়ে সব নিয়ম কানুন মানবে বা আমার হয়ে এই বিয়েতে থাকবে। রিলেটিভ যারা আছে তাদের দেখি নি প্রায় কত শত বছর। কানেকশনও নেই। আমাদের বিয়েতে তো তাহলে কেউই আসবে না। মন খারাপ করে।
.
রিয়ান এই কথা শুনে আমার দুই গালে হাত রাখে। তারপর মাথা উঁচু করে বলে।
— আমারই বা কে আছে বলো?? হ্যাঁ আমার কিছু রিলেটিভ আছে যাদের বিয়েতে আসতে বলা হবে। যারা আমার আপন।
আর তাদের বাদে আমাদের কলিগসরা তো আছেই। তোমার ব্যাচমেট আর আমার সাথে যারা আছে তারা। এরাই তো আমাদের আসল ফ্যামিলি তাই না!! তো ওদের আসাতেই দেখবে আমাদের বিয়ে পুরো হৈ-হুল্লোড়ে মেতে উঠেছে।
তার উপর আমার কিউট দুইটা শালি আছে না। তারা কি আর তোমার বিয়ে পানশে হতে দিবে?? একদম ব্যান্ড বাজা বারাত নিয়ে হাজির হবে তারা।
.
রিয়ানের এমন কথায় আমি ফিক করে হেসে দেই। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলে।
.
— এই কয়েকদিন যাতে তোমার মুখে এইরকমই হাসি দেখি বুঝলে!
.
— হুম। কিন্তু বিয়েতে তো অনেক খরচ হবে। এত টাকা কিভাবে মেনেজ করবো??
.
— এই মেয়ে তোমাকে টাকার চিন্তা করতে বলেছি নি আমি? এই বিয়ের সকল খরচ আমার পক্ষ হতে আসবে। আর তোমার বর এতটা গরিবও নয় যে নিজের বিয়ের খরচ একা বহন করতে পারবে না। ভুলে যেও না আ’ম দ্যা বেস্ট কার্ডিলোজিস্ট ডাক্তার ইন ঢাকা সিটি। সো আমার টাকা পয়সার অভাব হবে তা তুমি ভাবলেও কি করে??
.
— আব তা না!! কনে পক্ষ হতে যে খরচ মানে…
.
আর কিছু বলতে যাব তার আগেই রিয়ান তার আঙুল আমার ঠোঁটে চেপে ধরে বলে।
.
— হুসসস!! নো মোর ওয়ার্ডস। আমার কনে কে আমি বিনা খরচে নিব। তাতে কার কি?? আমি শুধু তোমায় চেয়েছি। অন্য কিছু পাব বলে তো চাই নি!! নিজের অন্ধকার ঘেরা জীবনে আলো চেয়েছি। আর সেই আলো যে তুমি!
তাহলে ভাবলেও কি করে যে আমার তোমার বাদে ওইসব চিন্তা ভাবনাও আছে?? আমি আগেও বলেছি এখনো বলছি। তুমি আমার আসক্তি! আর আমি শুধু নিজের আসক্তিকেই পেতে চাই আর কিছুই না।
তো পরের বার এইসব ধরনের কথা শুনলে মেরে তক্তা বানিয়ে দিব হুহহ!! বলে আমার ঠোঁট থেকে আঙুল সরিয়ে নেয়।
.
আমি ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। কখনো ভাবি নি যে আমার জীবনে এমন ভালবাসাও আসবে। যে কিনা আমায় সবার আগে রাখবে। আমায় ঘিরেই তার এত সত স্বপ্ন হবে। জানি না এই ভালবাসা সইবে কি না? কিন্তু যতদিনই থাকুক না কেন, আমি চাই সেই সময়টুকু প্রাণ খুলে অনুভব করতে।
.
— এত কেন ভালবাসেন??
.
— জানি না কেন এত ভালবাসি!! শুধু এতটুকুই জানি আমার আসক্তি যে তুমি। ভালবাসা নামক এক চিরস্থায়ী আসক্তি তুমি।
.
আমি প্রতিউত্তরে শুধু মিষ্টি একটা হাসি দিলাম। তা দেখে তিনি বলে।
.
— এখন যাও আমার জন্য কিছু রেধে নিয়ে আসো। খুব খিধে পেয়েছে।
.
— কি খাবেন বলুন?
.
— যা আছে তাই!
.
— আচ্ছা একটু বসুন এখনই নিয়ে আসছি।
এই বলে আমি রান্না ঘরের দিকে অগ্রসর হলাম।
.
.
??
.
.
খাওয়া শেষে সব কিছু গুছিয়ে রিয়ানকে খুঁজছি। সারা বাড়ি খুঁজে যখন তার দেখা মিললো না তখন নিজের রুমের দিকে অগ্রসর হলাম।
রুমে গিয়ে দেখি সে সটান হয়ে শুয়ে আছে। তা দেখে সাথে সাথে ভ্রু জোড়া আমার কুচকিয়ে এলো। আমি তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলি।
.
— আপনি এইখানে এইভাবে শুয়ে আছেন কেন?
.
সে চোখ বন্ধ রেখেই বলে,
— তো কিভাবে শুবো কাধ হয়ে?
.
— না মানে বাসায় যাবেন না? আমার বেডে শুয়ে আছেন কেন? যান বাসায় যান বলছি!!
.
— উহু!! আজ নিজের শ্বশুরবাড়ি থাকবো।
.
— কিসের শ্বশুরবাড়ি? কোথাকার শ্বশুরবাড়ি? কোথায় শ্বশুরবাড়ি? কি শ্বশুরবাড়ি? কোন শ্বশুরবাড়ি? কেমন শ্বশুরবাড়ি?
.
সে চোখ খুলে বলে।
— অহো রিয়ুপাখি এত প্রশ্ন করো কেন বুঝি না তো!! আজ আমি আমার বউয়ের সাথে বউয়ের বাবা বাড়ি থাকবো। এইবার বুঝেছো? এখন ঘুমাতে দাও। খুব ঘুম পেয়েছে। বলে আমার ঘুমিয়ে পড়ে।
.
— এই না না!! আপনি এইখানে থাকতে পারবেন না!! যান নিজের বাসায় যান। বিয়ের আগে নো থাকা থাকি।
.
— ফোর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন উই আর মেরিড।
.
— সেটা আমরা জানি অন্যরা তো আর না। পাশের বাসার মানুষরা কি ভাববে??
.
— এগেইন ফোর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন তোমার আশে পাশের ফ্ল্যাটে কেউ থাকে না।
.
আমি এইবার চোখ মিটিমিটি করে তাকিয়ে বলি।
— আপনি কিভাবে জানলেন যে আমার আশে পাশের ফ্ল্যাটে কেউ থাকে না?
.
এইবার রিয়ান হুট করেই উঠে বসে। চোখ মুখ কেমন জানি হয়ে যায়। কিন্তু তাও নিজেকে নরমাল রেখে বলে।
— বউ যখন জামাই থেকে দূরে থাকে তখন জামাই বউয়ের ইনফরমেশন এমনে এমনেই জেনে যায়।
তোমার কি মনে হয় আমি তোমার কোন খোঁজ খবর রাখি না? আমি এই কয়েকদিনে তোমার সব ইনফরমেশন জেনে নিয়েছি মাই লাভ।
.
— অহহ আচ্ছা।
.
রিয়ান আবার শুয়ে পড়ে বলে।
— দ্যান প্রবলেম ইজ সলভড। এখন ঘুমাতে আসো ঘুম পেয়েছে।
.
— এই না না!! আপনি এইখানে থাকতে পারবেন না। এখনই বাসায় যান বলছি!!
.
— রিয়ুপাখি রাগ উঠিও না। রাগ উঠলে কিন্তু পরে তোমার জন্যই খারাপ হবে। তাই যা বলছি তাই করো তা না হলে!! চোখ গরম করে।
.
আমি এইবার কিছুটা চুপসে যাই। তার রাগ সম্পর্কে আমার জানা আছে। রাঙামাটিতে একদিন আমি জীদ করে তার সাথে কথা বলি নি। তাই তিনি পরে রাতের বেলা আমায় কোলে করে ট্যান্ট থেকে তুলে নিয়ে এসে নিজের ট্যান্টে এনে বসিয়ে রেখেছিলেন। তারপর কথা না বলার শাস্তি স্বরুপ সেইদিন সারারাত আমায় বকবক করতে বলেছিলেন। কথা বন্ধ করলেই স্কেলের বারি। সেইদিন সারারাত বকবক করতে করতে চাপা ব্যথা হয়ে গিয়েছিল আমার। ওই কথাটা ভেবেই গা শিউরে উঠলো।
আমি এইবার কিছুটা মলিন হাসি মুখে টেনে বলি।
.
— আচ্ছা আপনি ঘুমান আমি অন্য রুমে চলে যাচ্ছি।
.
— এক পাও যদি ওখান থেকে লড়েছ তাহলে তোমার খবর আছে। চুপচাপ লাইট অফ করে আমার পাশে এসে ঘুমাও। তা না হলে…
.
— আরেহ আরেহ আসতেছি তো। কথায় কথায় থ্রেট দেন কেন?? খারুস জানি কোথাকার!!
.
— আমি জানি আমি খারুস। এখন তুমি আসবে না আমি আসবো?
.
অতঃপর বাধ্য হয়ে আমি লাইট অফ করে তার পাশে শুয়ে পড়ি। শুয়ে পড়তেই তিনি আমায় টেনে নিজের বাহুদরে আবদ্ধ করে নিলেন।
— এইভাবে ঘুমিয়ে থাকো। কোন নড়াচড়া না।
.
আমিও আর কিছু না বলে তাকে জড়িয়েই শুয়ে পড়ি। আজ সত্যি মনে হচ্ছে যে কেউ আছে আমায় আগলে রাখতে। মনের মধ্যে নেই কোন ভয় নেই কোন সংশয়।
হঠাৎ নাকে সেই চিরচেনা গন্ধটি ভেসে আসে। কিন্তু আমি কিছুতেই সেই গন্ধটি চেনে উঠতে পারছি না। এমন একটা ফিলিং আসছে যে, ” চেনা চেনা তবুও যেন অচেনা”।
অনেক চেষ্টা করেও যখন বুঝে উঠতে পারলাম তখন হাল ছেড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
.
.
??
.
.
কফি সোপে বসে আছি। সামনেই আরিশা আর রিংকি। রিংকি আয়নাতে নিজের লিপস্টিক ঠিক করছে আর আরিশা ফোনে কি জানি করছে। আমি একবার রিংকির দিকে তাকাচ্ছি আরেক বার আরিশার দিকে।
তারপর আমি গলাটা ঝেড়ে বলি।
.
রিয়ানাঃ তোরা কি আমার কথাটাও শুনবি নাকি খালি এইসব এই করবি??
.
দুইজন দুইজনের কাজের মধ্যে মনোযোগ দিয়েই বলে।
— হুম বলতে থাক শুনতাসি।
.
রিয়ানাঃ আরেহ না তাকালে বলবো কি করে??
.
রিংকি নিজের লিপস্টিক দেওয়াটা একটু থামিয়ে বলে।
রিংকিঃ না দেখলেও কথা শুনা যায় বুজলি!! তো বলতে থাক শুনতাসি বলতে থাক!! বলে আমার লিপস্টিক দেওয়ায় মন দিল।
.
আমি এইবার নাক ফুলিয়ে বলি।
রিয়ানাঃ আগামী মাসের ৫ তারিখ আমার বিয়ে!!
.
এই কথা শুনার সাথে সাথে রিংকি লিপস্টিক তেড়া হয়ে যায়। আর গালে লেগে যায়। আরিশার হাতে থাকা ফোন নিচে পড়ে যায়। দুইজনে ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন আমি কোন এক অসম্ভব কথা বলে দিয়েছি।
হুট করে দুইজনে একই সাথে একই তালে চেঁচিয়ে উঠে।
.
— কিইইইইইই